মানব ইতিহাসে প্লেগকে সাধারণত ঘনবসতিপূর্ণ শহর, নোংরা পরিবেশ এবং ইঁদুরের বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু নতুন এক গবেষণা সেই ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিজ্ঞানীরা প্রায় ৫,৫০০ বছর আগের মানুষের দাঁত থেকে সংগৃহীত প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করে এমন প্রমাণ পেয়েছেন, যা দেখায় যে প্লেগ তখনও প্রাণঘাতী মহামারি হিসেবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছিল।
প্রাচীন দাঁতে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস
গবেষকরা সাইবেরিয়ার বাইকাল হ্রদের আশপাশে বসবাসকারী শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর কঙ্কাল পরীক্ষা করেন। দাঁতের ভেতরে সংরক্ষিত জীবাণুর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে তারা প্লেগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৫,০৫০ এবং ৫,৫২০ বছর আগে অন্তত দুটি বড় সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল।
পরীক্ষায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের চারটি কবরস্থানে সমাহিত মানুষের প্রায় ৪০ শতাংশ প্লেগে আক্রান্ত ছিলেন। এই হার মধ্যযুগের কিছু বিখ্যাত প্লেগ কবরস্থানের চেয়েও বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

শিশু ও কিশোরদের মৃত্যু ছিল বেশি
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও কিশোরদের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞানীরা এমন এক বিষাক্ত উপাদানের সন্ধান পেয়েছেন, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় করে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, এই কারণেই অল্পবয়সীদের মধ্যে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। একই সময়ে অনেক ক্ষেত্রে ভাইবোন কিংবা বাবা-মা ও সন্তানকে একসঙ্গে সমাহিত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়।
শহর নয়, ছোট সম্প্রদায়েও ছড়িয়েছিল রোগ
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, বড় শহর এবং গবাদিপশুর ঘন উপস্থিতি ছাড়া প্লেগের মতো মহামারি বিস্তার সম্ভব নয়। কিন্তু বাইকাল অঞ্চলের মানুষ ছিল ছোট ছোট চলমান শিকারি-সংগ্রাহক সম্প্রদায়ের সদস্য।
এতে বোঝা যাচ্ছে, প্লেগ ছড়াতে বড় শহরের প্রয়োজন ছিল না। গবেষণায় আরও ইঙ্গিত মিলেছে যে রোগটি শুধু পোকামাকড়ের মাধ্যমে নয়, শরীরের তরল পদার্থ বা বাতাসের ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমেও ছড়িয়ে থাকতে পারে।
প্লেগের উৎস নিয়ে নতুন প্রশ্ন
গবেষকরা এখনও নিশ্চিত নন, কীভাবে এই সংক্রমণের সূচনা হয়েছিল। তবে একই ধরনের জীবাণুর চিহ্ন পরে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলেও পাওয়া গেছে। এর অর্থ হতে পারে, ইউরেশিয়া জুড়ে বিস্তৃত কোনো প্রাণীভিত্তিক উৎস থেকে রোগটি ছড়িয়েছিল।
কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে পশুর চামড়া বা অন্য কোনো অজানা বাহকের সাহায্যেও সংক্রমণ বিস্তার লাভ করে থাকতে পারে।
অতীতের রোগ, ভবিষ্যতের শিক্ষা
আজকের বিশ্বে প্লেগ আর আগের মতো ভয়াবহ হুমকি নয়। আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার কারণে মৃত্যুহার অনেক কমে এসেছে। তবে গবেষকদের মতে, হাজার হাজার বছরের রোগজীবাণুর বিবর্তন বুঝতে পারলে ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলা, রোগ নজরদারি এবং নতুন ভ্যাকসিন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
করোনাভাইরাস মহামারির অভিজ্ঞতার পর এমন গবেষণার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অতীতের জীবাণুর ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে চান।
৫,৫০০ বছর আগের প্লেগের প্রমাণ মানব ইতিহাসে মহামারির ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। গবেষণাটি দেখাচ্ছে, সভ্যতার প্রাথমিক পর্যায়েও সংক্রামক রোগ মানুষের জীবন ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















