০৮:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
রবিন হুডের অন্ধকার অধ্যায়: কিংবদন্তিকে নতুনভাবে দেখাল ‘দ্য ডেথ অব রবিন হুড’ প্লেভের সাফল্যে উজ্জীবিত দক্ষিণ কোরিয়ার ভার্চুয়াল আইডল বাজার, একের পর এক নতুন গ্রুপের আত্মপ্রকাশ গাজীপুরের টঙ্গীতে মবিল রিসাইক্লিং কারখানায় আগুন, দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে সাইবার হামলা কি যুদ্ধের সমান? আন্তর্জাতিক আইনের নতুন সীমারেখা শাহ মাহমুদ কোরেশি খালাস, ৯ মে মামলায় ইয়াসমিন রশিদসহ চার পিটিআই নেতা ১০ বছরের কারাদণ্ড এআই দুনিয়ায় নতুন শক্তি হতে চায় জেন স্ট্রিট, গোপনীয়তা ভেঙে বিনিয়োগে বড় পদক্ষেপ জাপানে ভিসা ফি পাঁচ গুণ, ৪৮ বছর পর বড় পরিবর্তন কার্যকর জুলাই থেকে ব্যাংকে বন্ধক রাখা সোনা উধাও! আতঙ্কে হাজারো গ্রাহক, বাড়ছে ক্ষোভ ২০২২ সালে কেমন ছিলো শেরউড অরণ্যের জীবন্ত কিংবদন্তি: হাজার বছরের সাক্ষী মেজর ওক নবায়নযোগ্য জ্বালানির যুগে ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যুৎ নয়, গ্রিড

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ কি মানুষকেই বেছে নেবে?

প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নতুন কোনো উদ্ভাবন কেবল অর্থনীতি বা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বদলে দেয় না; মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাকেও পাল্টে দিতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই ধরনের এক প্রযুক্তি। আমরা এখন এমন এক যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রশ্নটি শুধু এআই কত শক্তিশালী হবে তা নয়; বরং মানুষ কতটা মানবিক থাকতে পারবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গত কয়েক দশকে প্রযুক্তি আমাদের জীবনে অভূতপূর্ব সুবিধা এনে দিয়েছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এই সংযোগের মধ্যেই এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাও জন্ম নিয়েছে। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক ক্ষেত্রে কম সম্পর্কিত। মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

এআই এই প্রবণতাকে আরও গভীর করতে পারে। কারণ এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং এমন এক ব্যবস্থা, যা মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করতে পারে, স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং এক ধরনের সঙ্গীর ভূমিকাও পালন করতে পারে। এখানেই এর শক্তি এবং ঝুঁকি—দুটোই নিহিত।

টেলিভিশন মানুষের মনোযোগ দখল করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এআই মানুষের আবেগ, সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করতে সক্ষম। এটি ধৈর্যশীল, সব সময় উপস্থিত এবং কোনো মানবিক দাবি ছাড়াই মানুষের কথা শুনতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে, মানুষ কি ধীরে ধীরে অন্য মানুষের বদলে প্রযুক্তির ওপর আবেগগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠবে?

এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অনেকেই যুক্তি দেন, এআই কখনোই মানুষের মতো চেতনাসম্পন্ন হবে না, তার আত্মা থাকবে না, তাই মানুষ সহজেই পার্থক্য বুঝতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হয়তো আরও জটিল। মানুষের অনুভূতি ও আচরণের বিপুল তথ্যভান্ডারের ওপর প্রশিক্ষিত এআই এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যা অনেকের কাছে মানবিক বলেই মনে হবে। প্রশ্ন তখন প্রযুক্তির প্রকৃতি নিয়ে নয়; বরং মানুষের উপলব্ধি নিয়ে।

গণতন্ত্র, সমাজ এবং সভ্যতা মূলত মানুষের পারস্পরিক উপস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি সমাজ টিকে থাকে তখনই, যখন নাগরিকেরা একে অপরকে দেখে, শোনে, বোঝে এবং একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সামাজিক আস্থা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতা—এসবই বাস্তব মানবিক সম্পর্কের ফল। যদি মানুষের অভিজ্ঞতার বড় অংশ ভার্চুয়াল পরিসরে স্থানান্তরিত হয়, তবে গণতন্ত্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা মানুষকে নিরাপত্তা দিয়েছিল বটে, কিন্তু একই সঙ্গে দেখিয়েছিল যে সামাজিক বন্ধন কেবল একটি বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। মানুষ একা থাকার জন্য তৈরি নয়। পরিবার, প্রতিবেশ, বন্ধু, সহকর্মী—এই সম্পর্কগুলোই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের ভিত্তি।

এ কারণেই আগামী দশকগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং তার সঙ্গে সহাবস্থানের একটি মানবিক পথ খুঁজে বের করা। এআই আমাদের কাজকে সহজ করবে, নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে এবং জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। কিন্তু সেটি যেন মানুষের বিকল্প না হয়ে ওঠে, বরং মানুষের সক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করার উপায় হয়—সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে মূল কাজ।

ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তব মানবিক সংযোগ। মানুষের পাশে মানুষ থাকা, একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, সংকটে সহায়তা করা, মতবিনিময় করা এবং একটি অভিন্ন সামাজিক জীবনের অংশ হওয়া—এসবের কোনো ডিজিটাল বিকল্প নেই।

এআই বিপ্লবের প্রকৃত পরীক্ষাও সম্ভবত এখানেই। প্রশ্নটি প্রযুক্তি কত দূর যেতে পারে তা নয়; বরং মানুষ কতটা সচেতনভাবে বাস্তব মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন এবং যৌথ নাগরিক জীবনের মূল্য ধরে রাখতে পারে। ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত যন্ত্রের নয়, মানুষের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে। আর সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

রবিন হুডের অন্ধকার অধ্যায়: কিংবদন্তিকে নতুনভাবে দেখাল ‘দ্য ডেথ অব রবিন হুড’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ কি মানুষকেই বেছে নেবে?

০৬:৩৯:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন নতুন কোনো উদ্ভাবন কেবল অর্থনীতি বা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বদলে দেয় না; মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাকেও পাল্টে দিতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই ধরনের এক প্রযুক্তি। আমরা এখন এমন এক যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রশ্নটি শুধু এআই কত শক্তিশালী হবে তা নয়; বরং মানুষ কতটা মানবিক থাকতে পারবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গত কয়েক দশকে প্রযুক্তি আমাদের জীবনে অভূতপূর্ব সুবিধা এনে দিয়েছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এই সংযোগের মধ্যেই এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাও জন্ম নিয়েছে। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক ক্ষেত্রে কম সম্পর্কিত। মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

এআই এই প্রবণতাকে আরও গভীর করতে পারে। কারণ এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং এমন এক ব্যবস্থা, যা মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করতে পারে, স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং এক ধরনের সঙ্গীর ভূমিকাও পালন করতে পারে। এখানেই এর শক্তি এবং ঝুঁকি—দুটোই নিহিত।

টেলিভিশন মানুষের মনোযোগ দখল করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এআই মানুষের আবেগ, সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করতে সক্ষম। এটি ধৈর্যশীল, সব সময় উপস্থিত এবং কোনো মানবিক দাবি ছাড়াই মানুষের কথা শুনতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে, মানুষ কি ধীরে ধীরে অন্য মানুষের বদলে প্রযুক্তির ওপর আবেগগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠবে?

এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অনেকেই যুক্তি দেন, এআই কখনোই মানুষের মতো চেতনাসম্পন্ন হবে না, তার আত্মা থাকবে না, তাই মানুষ সহজেই পার্থক্য বুঝতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হয়তো আরও জটিল। মানুষের অনুভূতি ও আচরণের বিপুল তথ্যভান্ডারের ওপর প্রশিক্ষিত এআই এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যা অনেকের কাছে মানবিক বলেই মনে হবে। প্রশ্ন তখন প্রযুক্তির প্রকৃতি নিয়ে নয়; বরং মানুষের উপলব্ধি নিয়ে।

গণতন্ত্র, সমাজ এবং সভ্যতা মূলত মানুষের পারস্পরিক উপস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি সমাজ টিকে থাকে তখনই, যখন নাগরিকেরা একে অপরকে দেখে, শোনে, বোঝে এবং একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সামাজিক আস্থা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতা—এসবই বাস্তব মানবিক সম্পর্কের ফল। যদি মানুষের অভিজ্ঞতার বড় অংশ ভার্চুয়াল পরিসরে স্থানান্তরিত হয়, তবে গণতন্ত্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা মানুষকে নিরাপত্তা দিয়েছিল বটে, কিন্তু একই সঙ্গে দেখিয়েছিল যে সামাজিক বন্ধন কেবল একটি বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। মানুষ একা থাকার জন্য তৈরি নয়। পরিবার, প্রতিবেশ, বন্ধু, সহকর্মী—এই সম্পর্কগুলোই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের ভিত্তি।

এ কারণেই আগামী দশকগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং তার সঙ্গে সহাবস্থানের একটি মানবিক পথ খুঁজে বের করা। এআই আমাদের কাজকে সহজ করবে, নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে এবং জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। কিন্তু সেটি যেন মানুষের বিকল্প না হয়ে ওঠে, বরং মানুষের সক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করার উপায় হয়—সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে মূল কাজ।

ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তব মানবিক সংযোগ। মানুষের পাশে মানুষ থাকা, একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, সংকটে সহায়তা করা, মতবিনিময় করা এবং একটি অভিন্ন সামাজিক জীবনের অংশ হওয়া—এসবের কোনো ডিজিটাল বিকল্প নেই।

এআই বিপ্লবের প্রকৃত পরীক্ষাও সম্ভবত এখানেই। প্রশ্নটি প্রযুক্তি কত দূর যেতে পারে তা নয়; বরং মানুষ কতটা সচেতনভাবে বাস্তব মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন এবং যৌথ নাগরিক জীবনের মূল্য ধরে রাখতে পারে। ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত যন্ত্রের নয়, মানুষের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে। আর সেই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকেই।