মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বহু চুক্তিই কাগজে যতটা আশাব্যঞ্জক দেখায়, বাস্তবে ততটা কার্যকর হয় না। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সেই পুরোনো বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এটি আপাতদৃষ্টিতে উত্তেজনা কমানোর একটি কূটনৈতিক সাফল্য বলে মনে হলেও, এর ভাষা, কাঠামো এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন একটি চিত্র ফুটে ওঠে।
মূল প্রশ্ন হলো, এই সমঝোতা কি সত্যিই দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির পথে অগ্রগতি, নাকি এটি এমন একটি নথি যা উভয় পক্ষকে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি করবে?
চুক্তিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর অস্পষ্টতা। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নিরাপত্তা গ্যারান্টি কিংবা আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। বরং গুরুত্বপূর্ণ সব প্রশ্ন ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সমঝোতার চেয়ে আলোচনার কাঠামো তৈরির দলিল হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হয়।
এ ধরনের ব্যবস্থার রাজনৈতিক সুবিধা অবশ্য আছে। ওয়াশিংটন বলতে পারে যে তারা সংঘাত কমানোর পথে অগ্রসর হয়েছে, আর তেহরান দাবি করতে পারে যে তারা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার না করেই আলোচনার টেবিলে এসেছে। কিন্তু কূটনৈতিক ইতিহাস দেখায়, যখন একটি নথি উভয় পক্ষকে একই সঙ্গে বিজয়ের দাবি করার সুযোগ দেয়, তখন তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলো সাধারণত অমীমাংসিতই থেকে যায়।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে ইসরায়েলের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এই সমঝোতার বেশ কিছু অংশ এমন ধারণা তৈরি করে যে ওয়াশিংটন ও তেহরান নিজেদের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষগুলোর অবস্থান পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথে নতুন বাধা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

পারমাণবিক ইস্যুতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। ইরান আবারও ঘোষণা করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। কিন্তু এ ধরনের ঘোষণা নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরেই তেহরান একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে আসছে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, পরিদর্শন পদ্ধতি এবং জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সীমা নিয়ে কী ধরনের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমান নথি সেই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর দেয় না।
অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং অর্থনৈতিক সুবিধার প্রসঙ্গ তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্টভাবে এসেছে। তেল রপ্তানি, আর্থিক লেনদেন এবং অবরুদ্ধ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা ইরানের জন্য উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা যেতে পারে। যদিও এসব সুবিধার পূর্ণ বাস্তবায়ন ভবিষ্যৎ চুক্তির ওপর নির্ভরশীল, তবু আলোচনার এই পর্যায়েই তেহরান কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা নিজেদের জনগণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখার ধারণা। কাগজে এটি ভারসাম্যপূর্ণ মনে হলেও বাস্তবে এর অর্থ হতে পারে, ইরানের ওপর নতুন চাপ আরোপ করা হবে না, সামরিক হামলার ঝুঁকি কমবে এবং বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার জন্য তেহরানকে তাৎক্ষণিকভাবে বাধ্য করা হবে না। ফলে আলোচনার সময় যত দীর্ঘায়িত হবে, তত বেশি সুবিধা পেতে পারে সেই পক্ষ, যার ধৈর্য ও সময়ক্ষেপণের কৌশল বেশি কার্যকর।
ইরান বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় কঠোর অবস্থান, ধীরগতি এবং কৌশলগত নমনীয়তার এক অনন্য সমন্বয় দেখিয়ে এসেছে। তাদের আলোচনার পদ্ধতির একটি বৈশিষ্ট্য হলো চূড়ান্ত লক্ষ্যকে ধাপে ধাপে পুনর্নির্ধারণ করা এবং সময়কে কূটনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা। এই সমঝোতার বর্তমান কাঠামো সেই কৌশলের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে বলেই মনে হয়।
অবশ্য এই চুক্তিকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলাও ঠিক হবে না। সংঘাতময় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা কমানো, যোগাযোগের পথ খোলা রাখা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরি করা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু সেই অর্জন তখনই অর্থবহ হবে, যখন পরবর্তী পর্যায়ে বাস্তব ও যাচাইযোগ্য অঙ্গীকার সামনে আসবে।
বর্তমান অবস্থায় এই সমঝোতা শান্তির স্থায়ী ভিত্তির চেয়ে বরং একটি অনিশ্চিত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বলেই বেশি মনে হয়। যদি আলোচনার ধরন ও কৌশলে মৌলিক পরিবর্তন না আসে, তাহলে ভবিষ্যতে এই নথিকে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী ভুল বোঝাবুঝির সূচনা হিসেবে মনে রাখার সম্ভাবনাই বেশি।
কুনি মিয়াকে 


















