বিশ্ব অর্থনীতির শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, গত তিন দশকে মাথাপিছু উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে। অন্য একটি পক্ষ বলছে, প্রচলিত পরিসংখ্যান পুরো বাস্তবতা তুলে ধরে না; জীবনমান ও ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে ইউরোপ এখনও অনেকটাই প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন পরিমাপের পদ্ধতি। অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে কোন সূচক ব্যবহার করলে দেশগুলোর প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থান সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় তা নিয়ে।
অর্থনৈতিক ব্যবধান কি সত্যিই বেড়েছে?
প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্সসহ পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশের মাথাপিছু জিডিপি পিছিয়ে পড়েছে। এই পরিমাপ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগিয়েছে, আর ইউরোপ সেই গতি ধরে রাখতে পারেনি।

তবে অন্য পক্ষের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, কেবল উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে অর্থনৈতিক কল্যাণ বিচার করা ঠিক নয়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে যদি পণ্য ও সেবার দাম কমে যায়, তাহলে তুলনামূলক কম উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে জীবনমানের উন্নতি জিডিপির প্রচলিত পরিসংখ্যানে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।
প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে মতবিরোধ
বিতর্কের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি খাতকে ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হওয়ায় দেশটির উৎপাদনশীলতা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তির সুফল বিশ্বের অন্যান্য দেশও কম দামে পণ্য ও সেবা ব্যবহার করে পেয়েছে।
একদল অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে ইউরোপের অর্থনৈতিক অবস্থান প্রচলিত হিসাবের চেয়ে ভালো দেখায়। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, প্রযুক্তির সুফল ভাগাভাগি হলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে খাটো করে দেখানোর কারণ হতে পারে না।
পরিসংখ্যানের সীমাবদ্ধতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন সময়ের অর্থনৈতিক তথ্য তুলনা করা অত্যন্ত জটিল কাজ। কারণ প্রতিটি দেশের ভোগব্যয়, পণ্যের ধরন ও মূল্য কাঠামো আলাদা। একটি দেশে জনপ্রিয় কোনো পণ্য অন্য দেশে নাও থাকতে পারে। ফলে একই মানদণ্ডে সব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান পরিমাপ করা সহজ নয়।
এ কারণেই ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে হিসাব করলে ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যায়। এটি সব সময় তথ্যের ভুলের কারণে নয়; বরং পরিমাপের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার ফল।
তবু কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিতর্ক
যদিও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, কয়েকটি বিষয়ে মোটামুটি ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইউরোপের তুলনায় দ্রুত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইউরোপের জন্য এটি একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, কেবল অন্য দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফলের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্রযুক্তি বিস্তারের সময় এই বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ আগামী দশকে অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণে প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতার ভূমিকা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কে প্রকৃতপক্ষে এগিয়ে—তার চূড়ান্ত উত্তর এখনও মেলেনি। তবে জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতি নিয়ে এই বিতর্ক অর্থনীতির জগতে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















