বিশ্বের চকলেট শিল্পের বাজারমূল্য এখন বিপুল। কিন্তু এই শিল্পের মূল কাঁচামাল কোকো উৎপাদন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা চাপে পড়েছে। পশ্চিম আফ্রিকায় দুর্বল ফলনের কারণে ২০২৪ সালে কোকোর দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি টনে ১০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। যদিও পরে দাম কিছুটা কমেছে, তবু তা এক দশক আগের তুলনায় অনেক বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে কোকো উৎপাদন বাড়ানোর নতুন উপায় খুঁজছেন গবেষকরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, কোকো গাছের পরাগায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এমন একদল ক্ষুদ্র রক্তচোষা পোকা, যাদের উপস্থিতি ছাড়া চকলেট শিল্পের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
পরাগায়নের রহস্য
বেশিরভাগ ফুলগাছের মতো কোকো গাছও প্রাণী ও উদ্ভিদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। ফুলের মধু বা অন্যান্য উপাদান পোকামাকড়কে আকর্ষণ করে। তারা ফুলে ঢুকে খাদ্য সংগ্রহের সময় এক ফুল থেকে অন্য ফুলে পরাগরেণু বহন করে, ফলে পরাগায়ন সম্পন্ন হয়।

কিন্তু কোকো ফুলের ক্ষেত্রে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ধোঁয়াশায় ছিল। কোকো ফুল আকারে খুব ছোট, গঠনেও জটিল। ফুলের ভেতরের অংশ সহজে দেখা যায় না। ফলে কোন পোকা আসলে পরাগায়নের কাজ করছে, তা নির্ধারণ করা গবেষকদের জন্য কঠিন ছিল।
ক্ষুদ্র রক্তচোষা পোকার আধিপত্য
গবেষকরা মালয়েশিয়া ও ফরাসি গায়ানার কোকো বাগানে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ চালান। শুধু ফুলে আসা পোকা গোনা নয়, তারা ফুল খুলে ভেতরে কী ঘটছে সেটিও বিশ্লেষণ করেন। একই সঙ্গে ধরা পড়া পোকামাকড়ের শরীরে কোকোর পরাগরেণু আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় মোট ৪৪৯টি পোকা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৪৩৯টিই ছিল ক্ষুদ্র মিজ জাতীয় পোকা। এসব পোকা ফুলের প্রজনন অঙ্গের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ করছিল এবং তাদের শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কোকোর পরাগরেণু পাওয়া যায়।
অন্যদিকে মাছি, মৌমাছি বা অন্যান্য পোকামাকড়ও ফুলে দেখা গেলেও তাদের মধ্যে খুব কমই কার্যকর পরাগবাহক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে গবেষকদের ধারণা, কোকো গাছের পরাগায়নের প্রধান দায়িত্ব এই ক্ষুদ্র মিজ পোকারাই পালন করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চ্যালেঞ্জ

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এসব পোকা অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ও আর্দ্র পরিবেশে বেশি সক্রিয় থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের অনেক কোকো চাষাঞ্চল ক্রমেই উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে উঠছে।
এ কারণে ভবিষ্যতে এই পরাগবাহক পোকার সংখ্যা কমে গেলে কোকোর ফলনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে চকলেট শিল্পের জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাধানের পথ কী?
গবেষকদের মতে, কৃষিবনায়ন বা অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি পদ্ধতি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এই পদ্ধতিতে কোকো বাগানের মধ্যে স্থানীয় গাছ লাগানো হয়, যা ছায়া দেয়, তাপমাত্রা কমায় এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
এ ধরনের পরিবেশ ক্ষুদ্র মিজ পোকাদের জন্যও অনুকূল হতে পারে। ফলে তাদের সংখ্যা বাড়লে কোকো গাছের পরাগায়ন আরও কার্যকর হবে এবং ফলনও বৃদ্ধি পেতে পারে।
চকলেটপ্রেমীদের কাছে বিষয়টি বিস্ময়কর শোনাতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্বের প্রিয় চকলেটের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে এমন একদল ক্ষুদ্র রক্তচোষা পোকা, যাদের অস্তিত্বই কোকো উৎপাদনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















