একসময় বিশ্বসফরের মানেই ছিল এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে বেড়ানো। জনপ্রিয় শিল্পীরা কয়েক ডজন শহরে গিয়ে সরাসরি ভক্তদের সামনে গান পরিবেশন করতেন। কিন্তু এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষ সংগীত তারকারা ক্রমেই কম শহরে বেশি সংখ্যক কনসার্ট আয়োজন করছেন, ফলে ভক্তদেরই তাদের কাছে যেতে হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ জনপ্রিয় ব্রিটিশ গায়ক হ্যারি স্টাইলস। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ছয় মহাদেশে ৬০০-এর বেশি কনসার্ট করেছেন। তার আগের বিশ্ব সফরে ছিল ৭৯টি শহর। কিন্তু নতুন সফরে ৬৮টি কনসার্ট হলেও সেগুলো হচ্ছে মাত্র সাতটি শহরে। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে টানা ১২টি শো করার পর তিনি নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ৩০টি কনসার্ট করবেন।
শুধু হ্যারি স্টাইলস নন, বিশ্বের আরও অনেক বড় তারকা একই পথে হাঁটছেন। বিয়ন্সের সাম্প্রতিক সফরের অর্ধেকেরও বেশি অনুষ্ঠান হয়েছে মাত্র তিনটি ভেন্যুতে। কোল্ডপ্লে নির্দিষ্ট কয়েকটি শহরে দীর্ঘ সময় ধরে অনুষ্ঠান করেছে। অলিভিয়া রদ্রিগোও আসন্ন সফরে একই কৌশল অনুসরণ করবেন। অন্যদিকে আরিয়ানা গ্রান্ডের সফর সীমাবদ্ধ রয়েছে মাত্র তিনটি দেশে।
কেন বদলাচ্ছে কনসার্টের ধরন
সংগীত শিল্পে ভ্রমণভিত্তিক বড় সফর আয়োজন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। জ্বালানি খরচ, শ্রম ব্যয় এবং প্রশাসনিক নানা জটিলতা বেড়েছে। একই সঙ্গে দর্শকের প্রত্যাশাও বদলেছে। বিশাল মঞ্চ, আধুনিক আলো, প্রযুক্তিনির্ভর দৃশ্যায়ন এবং জাঁকজমকপূর্ণ সেট এখন প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এসব সরঞ্জাম এক দেশ বা শহর থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
ফলে শিল্পীদের জন্য একটি শহরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে একাধিক অনুষ্ঠান করা আর্থিকভাবে বেশি লাভজনক। এতে ব্যয় কমে এবং আয় বাড়ে।
নির্বাচিত শহরগুলোর অর্থনৈতিক লাভ
এই নতুন প্রবণতা আয়োজক শহরগুলোর জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। হ্যারি স্টাইলসের লন্ডন কনসার্ট ঘিরে দর্শকদের টিকিট, হোটেল, পরিবহন ও অন্যান্য খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কনসার্টকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসা, পর্যটন খাত এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও লাভবান হচ্ছে।
তবে এর বিপরীত প্রভাব পড়ছে ছোট ও আঞ্চলিক শহরগুলোর ওপর। যেসব শহর আগে বড় তারকাদের সফরের অংশ ছিল, তারা এখন সেই সুযোগ হারাচ্ছে। এর সঙ্গে হারাচ্ছে পর্যটক ও দর্শকদের ব্যয়ের মাধ্যমে আসা অর্থনৈতিক সুবিধাও।

কনসার্ট এখন এক ধরনের সাংস্কৃতিক তীর্থযাত্রা
মজার বিষয় হলো, ভক্তদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে না। বরং অনেকেই কনসার্টকে ভ্রমণের অংশ হিসেবে গ্রহণ করছেন। লন্ডনে হ্যারি স্টাইলসের কনসার্টে অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দর্শক শহরের বাইরে থেকে এসেছেন। অনেকেই এই সফরকে ছোট ছুটিতে পরিণত করেছেন।
ডিজিটাল যুগে গান শোনা যত সহজ হয়েছে, সরাসরি কনসার্টের সামাজিক ও আবেগগত মূল্য তত বেড়েছে। প্রিয় শিল্পীকে সামনে থেকে দেখা এখন শুধু বিনোদন নয়, বরং এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। অনেকের কাছে এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক তীর্থযাত্রা, যেখানে ভক্তরা তাদের প্রিয় তারকার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতেও প্রস্তুত।
সংগীত জগতের এই পরিবর্তন দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের বিশ্ব সফর হয়তো আরও বেশি শহর নয়, বরং কয়েকটি নির্বাচিত গন্তব্যকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















