০১:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
বাবার অসমান পায়ের পথচলার ঋণ শোধে জীবন উৎসর্গ মেয়ের বাবার ভালোবাসা সব সময় বলা হয় না, কখনও কখনও তা শুধু ত্যাগেই লেখা থাকে বিশ্বকাপে ইরানের সঙ্গে বৈষম্যের অভিযোগ, ক্ষোভে ফুটবল ফেডারেশন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ৫০ বিলিয়ন ডলারের আইনি লড়াই: ইউকোস মামলা নিয়ে নতুন বইয়ে ক্ষমতা ও ন্যায়বিচারের গল্প রকির লড়াকু মানসিকতায় অনুপ্রাণিত ব্রাজিল, লক্ষ্য বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দাপট স্বপ্নের বিশ্বকাপ মঞ্চে কেপ ভার্দের লোপেস, শিক্ষা আর সাহসেই বদলে গেল জীবন ইয়ামালের কাঁধে স্পেনের ভরসা, সৌদি আরব ম্যাচে প্রথম জয়ের খোঁজে ইউরো চ্যাম্পিয়নরা জাপানের চোখে জয়, তিউনিসিয়ার ভরসা নতুন কোচ—বিশ্বকাপের হাজারতম ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্ন উড়ছে বিশ্বকাপে, তবু সতর্ক কোচ পচেত্তিনো ব্রাজিলের দাপুটে জয়, প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় হাইতির

ডেভিড হকনির বিদায়: সুইমিং পুল, রঙ আর আলোর জাদুকরের শেষ অধ্যায়

বিশ্ব শিল্পাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ডেভিড হকনি আর নেই। ১১ জুন ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন ব্রিটেনের অন্যতম সাহসী ও উদ্ভাবনী এই চিত্রশিল্পী। কয়েক দশক ধরে তাঁর তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে মানুষ, প্রকৃতি, প্রেম, স্মৃতি এবং আলোর অনন্য রূপ, যা তাঁকে আধুনিক শিল্পের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পীতে পরিণত করেছে।

সুইমিং পুলের নীল জগত

ডেভিড হকনির নাম উচ্চারিত হলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে সুইমিং পুলের ছবি। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথম পৌঁছে আকাশ থেকে শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নীল পুলগুলো দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই মুগ্ধতাই পরে তাঁর শিল্পজীবনের অন্যতম পরিচয় হয়ে ওঠে।

তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘পোর্ট্রেট অব অ্যান আর্টিস্ট (পুল উইথ টু ফিগারস)’ শিল্প ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ২০১৮ সালে এটি নিলামে বিক্রি হয়ে জীবিত শিল্পীর আঁকা সবচেয়ে দামি চিত্রকর্মের রেকর্ড গড়েছিল। ছবিটিতে শুধু জল বা মানুষ নয়, আবেগ, সম্পর্ক ও বিচ্ছেদের গভীর গল্পও ফুটে উঠেছিল।

Celebrated British artist David Hockney dies aged 88 - BBC News

সংগ্রাম থেকে শিল্পের শিখরে

ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের ব্র্যাডফোর্ডে জন্ম নেওয়া হকনির শৈশব ছিল সাধারণ। সীমিত সামর্থ্যের পরিবারে বড় হলেও ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি ছিল তাঁর গভীর টান। পুরোনো জিনিস মেরামত ও নতুন রূপ দেওয়ার অভ্যাস ছিল তাঁর বাবার, যা ছেলেবেলায় হকনির কল্পনাশক্তিকে প্রভাবিত করেছিল।

শিল্পশিক্ষার জন্য তিনি লন্ডনে যান এবং পরে রয়্যাল কলেজ অব আর্টে ভর্তি হন। সেখানে প্রচলিত শিল্পধারার অনুসারী না হয়ে তিনি নিজের পথ তৈরি করেন। মানুষের জীবন, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে শিল্পের বিষয়বস্তু বানিয়ে তিনি দ্রুত নজর কাড়েন।

আমেরিকায় নতুন স্বাধীনতা

একটি পুরস্কারের অর্থ দিয়ে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান হকনি। সেই সফর তাঁর শিল্পীজীবনে নতুন মোড় এনে দেয়। নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ার উন্মুক্ত পরিবেশ তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তিনি একের পর এক নতুন মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

অ্যাক্রিলিক রং, প্যাস্টেল, জলরং কিংবা পেন্সিল—সবকিছুর মধ্যেই তিনি নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ‘এ বিগার স্প্ল্যাশ’ চিত্রকর্মে পানির ছিটে ও তরঙ্গের যে জীবন্ত উপস্থিতি দেখা যায়, তা আজও শিল্পপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।

Renowned British artist David Hockney dies aged 88

প্রযুক্তির সঙ্গে শিল্পের মেলবন্ধন

জীবনের শেষ পর্যায়েও হকনি থেমে থাকেননি। বরং নতুন প্রযুক্তিকে শিল্পচর্চার অংশ করে তুলেছিলেন। স্মার্টফোন ও আইপ্যাডে আঁকা ছবি দিয়ে তিনি দেখিয়ে দেন, শিল্পের ভাষা কখনো পুরোনো হয় না।

ইয়র্কশায়ারের প্রকৃতি, ঋতুর পরিবর্তন এবং আলোর নানা রূপ তিনি ডিজিটাল মাধ্যমে তুলে ধরেন। পরে ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে বসবাসকালে বসন্তের আগমনের ধারাবাহিক ডিজিটাল চিত্রকর্মও ব্যাপক প্রশংসা পায়।

এক জীবন, অসংখ্য অনুসন্ধান

ডেভিড হকনি নিজেকে শুধু একজন চিত্রকর হিসেবে দেখতেন না। তিনি ছিলেন এক নিরন্তর অনুসন্ধানী শিল্পী। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন মাধ্যম এবং নতুন অভিজ্ঞতা খুঁজে বের করাই ছিল তাঁর শিল্পযাত্রার মূল শক্তি।

জীবনের শেষদিকে তিনি তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীল পথচলাকে একটি বিশাল চিত্রগাথার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন—যেখানে এক মানুষের পুরো জীবন, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা রঙের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। তাঁর মৃত্যুতে শিল্পজগত একজন অসাধারণ স্রষ্টাকে হারালেও তাঁর সৃষ্টি আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।

ডেভিড হকনির মৃত্যুতে বিশ্ব শিল্পাঙ্গনে শোক। সুইমিং পুলের নীল জল থেকে ডিজিটাল শিল্প—সবখানেই রয়ে গেল তাঁর অনন্য স্বাক্ষর।

David Hockney dead: Iconic British artist dies aged 88

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বাবার অসমান পায়ের পথচলার ঋণ শোধে জীবন উৎসর্গ মেয়ের

ডেভিড হকনির বিদায়: সুইমিং পুল, রঙ আর আলোর জাদুকরের শেষ অধ্যায়

১১:৪৪:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

বিশ্ব শিল্পাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ডেভিড হকনি আর নেই। ১১ জুন ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন ব্রিটেনের অন্যতম সাহসী ও উদ্ভাবনী এই চিত্রশিল্পী। কয়েক দশক ধরে তাঁর তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে মানুষ, প্রকৃতি, প্রেম, স্মৃতি এবং আলোর অনন্য রূপ, যা তাঁকে আধুনিক শিল্পের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পীতে পরিণত করেছে।

সুইমিং পুলের নীল জগত

ডেভিড হকনির নাম উচ্চারিত হলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে সুইমিং পুলের ছবি। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথম পৌঁছে আকাশ থেকে শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নীল পুলগুলো দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই মুগ্ধতাই পরে তাঁর শিল্পজীবনের অন্যতম পরিচয় হয়ে ওঠে।

তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘পোর্ট্রেট অব অ্যান আর্টিস্ট (পুল উইথ টু ফিগারস)’ শিল্প ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ২০১৮ সালে এটি নিলামে বিক্রি হয়ে জীবিত শিল্পীর আঁকা সবচেয়ে দামি চিত্রকর্মের রেকর্ড গড়েছিল। ছবিটিতে শুধু জল বা মানুষ নয়, আবেগ, সম্পর্ক ও বিচ্ছেদের গভীর গল্পও ফুটে উঠেছিল।

Celebrated British artist David Hockney dies aged 88 - BBC News

সংগ্রাম থেকে শিল্পের শিখরে

ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের ব্র্যাডফোর্ডে জন্ম নেওয়া হকনির শৈশব ছিল সাধারণ। সীমিত সামর্থ্যের পরিবারে বড় হলেও ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি ছিল তাঁর গভীর টান। পুরোনো জিনিস মেরামত ও নতুন রূপ দেওয়ার অভ্যাস ছিল তাঁর বাবার, যা ছেলেবেলায় হকনির কল্পনাশক্তিকে প্রভাবিত করেছিল।

শিল্পশিক্ষার জন্য তিনি লন্ডনে যান এবং পরে রয়্যাল কলেজ অব আর্টে ভর্তি হন। সেখানে প্রচলিত শিল্পধারার অনুসারী না হয়ে তিনি নিজের পথ তৈরি করেন। মানুষের জীবন, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে শিল্পের বিষয়বস্তু বানিয়ে তিনি দ্রুত নজর কাড়েন।

আমেরিকায় নতুন স্বাধীনতা

একটি পুরস্কারের অর্থ দিয়ে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান হকনি। সেই সফর তাঁর শিল্পীজীবনে নতুন মোড় এনে দেয়। নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ার উন্মুক্ত পরিবেশ তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তিনি একের পর এক নতুন মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

অ্যাক্রিলিক রং, প্যাস্টেল, জলরং কিংবা পেন্সিল—সবকিছুর মধ্যেই তিনি নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ‘এ বিগার স্প্ল্যাশ’ চিত্রকর্মে পানির ছিটে ও তরঙ্গের যে জীবন্ত উপস্থিতি দেখা যায়, তা আজও শিল্পপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।

Renowned British artist David Hockney dies aged 88

প্রযুক্তির সঙ্গে শিল্পের মেলবন্ধন

জীবনের শেষ পর্যায়েও হকনি থেমে থাকেননি। বরং নতুন প্রযুক্তিকে শিল্পচর্চার অংশ করে তুলেছিলেন। স্মার্টফোন ও আইপ্যাডে আঁকা ছবি দিয়ে তিনি দেখিয়ে দেন, শিল্পের ভাষা কখনো পুরোনো হয় না।

ইয়র্কশায়ারের প্রকৃতি, ঋতুর পরিবর্তন এবং আলোর নানা রূপ তিনি ডিজিটাল মাধ্যমে তুলে ধরেন। পরে ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে বসবাসকালে বসন্তের আগমনের ধারাবাহিক ডিজিটাল চিত্রকর্মও ব্যাপক প্রশংসা পায়।

এক জীবন, অসংখ্য অনুসন্ধান

ডেভিড হকনি নিজেকে শুধু একজন চিত্রকর হিসেবে দেখতেন না। তিনি ছিলেন এক নিরন্তর অনুসন্ধানী শিল্পী। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন মাধ্যম এবং নতুন অভিজ্ঞতা খুঁজে বের করাই ছিল তাঁর শিল্পযাত্রার মূল শক্তি।

জীবনের শেষদিকে তিনি তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীল পথচলাকে একটি বিশাল চিত্রগাথার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন—যেখানে এক মানুষের পুরো জীবন, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা রঙের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। তাঁর মৃত্যুতে শিল্পজগত একজন অসাধারণ স্রষ্টাকে হারালেও তাঁর সৃষ্টি আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে।

ডেভিড হকনির মৃত্যুতে বিশ্ব শিল্পাঙ্গনে শোক। সুইমিং পুলের নীল জল থেকে ডিজিটাল শিল্প—সবখানেই রয়ে গেল তাঁর অনন্য স্বাক্ষর।

David Hockney dead: Iconic British artist dies aged 88