“আমি যদি পিছনে পড়ে যাই, জানি বাবা আমাকে ধরে ফেলবেন”— এই এক বাক্যেই ধরা পড়ে এক সন্তানের অগাধ বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু এমন একজন বাবা, যিনি ঘড়ি দেখে সময় বলতে পারেন না, টাকার হিসাব মিলাতে কষ্ট হয়, এমনকি ছেলেদের পেশাগত সাফল্যের অনেক কিছুই বোঝেন না। তবু সন্তানদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি।
৬৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মৃদু বুদ্ধিবিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতা ও মৃগীরোগ নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর দুই ছেলে ছোটবেলা থেকেই শুধু সন্তান নয়, বাবার রক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে।
শৈশবের স্মৃতিতে বাবার উদারতা
ছোটবেলায় দুই ভাই প্রায়ই বাবার কাছে চকলেট কেনার জন্য টাকা চাইত। বাবার সবচেয়ে প্রিয় ছিল দুই ডলারের নোট। কিন্তু সন্তানদের আবদার শুনলেই তিনি বিনা দ্বিধায় সেই নোট তুলে দিতেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ওই সামান্য অর্থও তাঁর কাছে অনেক মূল্যবান ছিল। তবু সন্তানদের খুশি করতে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। এই উদারতাই আজও ছেলেদের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
একজন ধীর-শিক্ষার্থী থেকে পরিবারের অভিভাবক
ছেলেরা ছোটবেলায় বুঝতে পারত, তাদের বাবা অন্যদের তুলনায় কিছু বিষয়ে ধীরগতির। সময় বলা, টাকা গোনা কিংবা জটিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না।
তবু সংসারের দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন আন্তরিক। বিয়ের পর ধীরে ধীরে তিনি বাবা হওয়ার দায়িত্বও বুঝে নেন। সন্তানদের খাওয়ানো, ডায়াপার বদলানো, স্কুলে প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেওয়া— সব কাজেই তিনি অংশ নিতেন।
কাজ থেকে ফিরে রাতের খাবার খাওয়ার আগেই সন্তানদের খোঁজ নিতেন। তারা ঠিকমতো খেয়েছে কি না, দুধ পান করেছে কি না— এসবই ছিল তাঁর প্রথম চিন্তা।
সংকটের সময় পরিবারের লড়াই
২০১১ সালে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। তাঁর আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শে জানা যায় তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র।
এর কিছুদিন পর তিনি কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। একই সময়ে তাঁর স্ত্রীরও শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। ফলে পরিবারের দুই প্রধান আয়ের উৎসই বন্ধ হয়ে যায়।
সে সময় পরিবারকে কঠিন আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দুই ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করে সংসারের পাশে দাঁড়ায়। চিকিৎসা, দেখভাল এবং দৈনন্দিন খরচ সামলাতে সবাইকে একসঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে।
সন্তানদের ত্যাগ আর সাফল্যের গল্প
পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে গিয়ে ছোট ছেলে নিজের পড়াশোনার পথও বদলাতে বাধ্য হয়। একসময় পূর্ণকালীন চাকরিতে যোগ দিয়ে পরিবারের খরচ বহন করে। পরে আবার পড়াশোনায় ফিরে গিয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে।
আজ দুই ভাইই নিজ নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত। একজন স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করছেন, অন্যজন নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কিন্তু তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো— তাঁরা একজন অসাধারণ বাবার সন্তান।
আজও একই রকম ভালোবাসা
বর্তমানে ওই ব্যক্তি একটি দিবাযত্ন ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়মিত যান। সেখানে সময় কাটান বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে। তাঁর জীবন এখন অনেকটাই নিয়মমাফিক ও স্থিতিশীল।
সম্প্রতি পরিবারের সদস্যরা তাঁর জন্মদিন উদযাপন করেছেন। তাঁকে উপহার দেওয়া হয়েছে বিশেষভাবে সাজানো পুরোনো দুই ডলারের নোটের সংগ্রহ। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তিনি ছিলেন ভীষণ আনন্দিত।
ছোট ছেলে স্বীকার করেন, তাঁর জীবনের অনেক অর্জনের কথা বাবা হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারেন না। কিন্তু তাতে ভালোবাসা কমে না।
তার ভাষায়, “বাবা হয়তো জানেন না আমি কী অর্জন করেছি। কিন্তু আমি জানি, পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ আছেন যিনি নিঃস্বার্থভাবে আমাকে ভালোবেসেছেন। আমি যদি চোখ বন্ধ করে পড়ে যাই, জানি বাবা আমাকে ধরে ফেলবেন।”
সেই বিশ্বাসই হয়তো একজন বাবার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
Sarakhon Report 



















