ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পর এমন এক বিরল প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, যা তাদের বহু বছরের পরিচিত উপকূলরেখাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। সমুদ্রের নিচে থাকা প্রবালপ্রাচীর ও সমুদ্রতলের অংশ হঠাৎ করেই ওপরে উঠে এসে ডাঙায় পরিণত হয়েছে। ফলে বহু এলাকায় উপকূল কয়েকশ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে।
গত ৮ জুন আঘাত হানা এই শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ে, ভূমিধসের ঘটনা ঘটে এবং অন্তত ৭৬ জনের প্রাণহানি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দক্ষিণাঞ্চলের মিন্ডানাও দ্বীপ।
মুহূর্তেই বদলে যায় পরিচিত দৃশ্য
সারাঙ্গানি প্রদেশের গ্লান এলাকার জেলে ও ধর্মীয় নেতা আরসেনিও বুটিল জুনিয়র জানান, ভূমিকম্প শুরু হলে তিনি আতঙ্কিত হয়ে প্রার্থনা করতে থাকেন। পরে চোখ খুলে দেখেন, সমুদ্রের পানি বারবার সরে যাচ্ছে এবং নিচে থাকা প্রবালগুলো ধীরে ধীরে পানির ওপরে উঠে আসছে।
তার ভাষায়, সমুদ্র কয়েক দফা পিছিয়ে যায় এবং আবার ফিরে আসে। সেই সময় অসংখ্য মাছ ভেসে উঠতে দেখা যায়। উপকূলের চেনা দৃশ্য মুহূর্তেই অপরিচিত হয়ে ওঠে।
স্থায়ীভাবে বদলে গেছে উপকূল
ভূকম্পবিদদের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রতল প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত ওপরে উঠে এসেছে। এর ফলে কিছু এলাকায় উপকূলরেখা প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত এগিয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি “উপকূলীয় উত্তোলন” নামে পরিচিত একটি প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক ঘটনা। পৃথিবীর ভূত্বকের গভীরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে এমন পরিবর্তন ঘটে এবং এটি স্থায়ী।
প্রভাবিত এলাকা প্রায় ১০০ কিলোমিটার বিস্তৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আতঙ্কে ঘরে ফিরছেন না অনেকে
ভূমিকম্পের পর অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাহাড়ি এলাকায় চলে গেছে। একটি গ্রামে প্রায় একশ নারী, পুরুষ ও শিশু এখনো অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, সমুদ্রতলের এই পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে সুনামি বা বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা এমন কোনো তাৎক্ষণিক বিপদের কথা বলেননি, তবু ভয় কাটেনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের।
অনেকের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও মাটিতে দীর্ঘ ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে পুনর্গঠন শুরু করার আগেও মানুষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চাইছে।
পর্যটন ও জীবিকায় বড় ধাক্কা
উপকূলের এই নাটকীয় পরিবর্তন স্থানীয় পর্যটন শিল্পের জন্যও নতুন সংকট তৈরি করেছে। আগে যেখানে সাদা বালুর সৈকত ঘেঁষে গভীর নীল সমুদ্র ছিল, এখন সেখানে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত প্রবালভূমি দেখা যাচ্ছে।
ফলে সাঁতার বা সমুদ্রভিত্তিক বিনোদনের সুযোগ কমে গেছে। পর্যটননির্ভর ব্যবসাগুলোও ক্ষতির আশঙ্কা করছে।
অন্যদিকে জেলেদের নৌকা এখন আগের মতো সহজে পানিতে নামানো যাচ্ছে না। মাছ ধরার কাজও ব্যাহত হচ্ছে।

থামছে না কম্পন
মূল ভূমিকম্পের পর থেকে এলাকায় ৮ হাজার ৫০০টির বেশি আফটারশকের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তারা। এর মধ্যেই বারবার মাটি কেঁপে ওঠায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে।
ফিলিপাইনের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, প্রকৃতির শক্তি শুধু ধ্বংসই আনে না, কখনো কখনো মুহূর্তের মধ্যে একটি অঞ্চলের ভূগোলও বদলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















