একসময় ধীরে হাঁটাও ছিল অসম্ভব। ডান পা মাটিতে রাখতে পারতেন না, জুতা-মোজা পরাও ছিল কষ্টকর। এমনকি রাতে কম্বলের সামান্য স্পর্শেও তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে উঠতেন ২২ বছর বয়সী এক তরুণ। তবে এখন আধুনিক চিকিৎসার সহায়তায় তার জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
একটি বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে মেরুদণ্ডে বৈদ্যুতিক স্পন্দন পাঠিয়ে ব্যথার সংকেত আটকে দেওয়ার চিকিৎসা তাকে নতুন করে স্বস্তি দিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি রোগ সারিয়ে তোলে না, তবে ব্যথার অনুভূতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে রোগীর জীবনমান উন্নত করে।
দুর্লভ রোগে বদলে যায় জীবন
তরুণটির সমস্যার শুরু হয় একটি দুর্ঘটনার পর। হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে ডান পায়ে আঘাত পান তিনি। শুরুতে ব্যথা তেমন না থাকলেও ধীরে ধীরে ব্যথা ও ফোলাভাব বাড়তে থাকে। পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার শরীরে ‘কমপ্লেক্স রিজিওনাল পেইন সিনড্রোম’ নামে একটি বিরল রোগ শনাক্ত হয়।
এই রোগ সাধারণত হাত, বাহু, পা বা পায়ের পাতায় আঘাতের পর দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যথা স্বাভাবিক আঘাতের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী থাকে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে অস্বাভাবিকতা তৈরি হলে এই রোগ দেখা দিতে পারে। এতে স্নায়ুগুলো অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও প্রদাহের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
ওষুধে কাজ না হওয়ায় নতুন পথ
প্রথমে ফিজিওথেরাপি ও বিভিন্ন ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হলেও তেমন ফল পাওয়া যায়নি। সময়ের সঙ্গে ব্যথা এতটাই বেড়ে যায় যে তা তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ধীরে ধীরে ক্রাচ থেকে হুইলচেয়ারে চলে যেতে হয় তাকে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়, পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে যাচ্ছেন বলেও মনে হতে থাকে।
এ অবস্থায় চিকিৎসকেরা তাকে একটি নতুন পদ্ধতির কথা জানান। এতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরের ভেতরে একটি ছোট পালস জেনারেটর বসানো হয়, যা মেরুদণ্ডের নির্দিষ্ট অংশে বৈদ্যুতিক স্পন্দন পাঠায়।
কীভাবে কাজ করে যন্ত্রটি
চিকিৎসকদের ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘জ্যামিং সিস্টেম’। মেরুদণ্ডের স্তরে ব্যথার সংকেতকে বাধাগ্রস্ত করে মস্তিষ্কে পৌঁছাতে দেয় না। ফলে রোগী ব্যথার অনুভূতি অনেক কম পান।
চিকিৎসার প্রথম ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে পাতলা তার মেরুদণ্ডের কাছে স্থাপন করা হয়। এক সপ্তাহের মতো সময় রোগী বাহ্যিক জেনারেটর ব্যবহার করে দেখেন, এতে কতটা উপকার পাওয়া যায়।
ফল ইতিবাচক হওয়ায় পরে স্থায়ীভাবে পালস জেনারেটর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এটি ত্বকের নিচে পেটের অংশে বসানো থাকে। আধুনিক সংস্করণের ব্যাটারি তারবিহীনভাবে পুনরায় চার্জও করা যায়।
জীবনে ফিরছে স্বাভাবিকতা
যন্ত্রটি প্রতিস্থাপনের পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ব্যথা কমতে শুরু করে। এরপর নিয়মিত ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় দুর্বল হয়ে যাওয়া পেশিগুলোও ধীরে ধীরে শক্তিশালী করা হয়।
কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি আবার ডান পা মাটিতে রাখতে এবং হাঁটতে সক্ষম হন। যদিও ব্যথা পুরোপুরি চলে যায়নি, তবুও আগের তুলনায় তার অবস্থা অনেক ভালো।
এখন তিনি দৈনন্দিন কাজগুলো আগের চেয়ে অনেক সহজে করতে পারেন। জীবনকে নতুনভাবে মূল্য দিতে শিখেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
কমপ্লেক্স রিজিওনাল পেইন সিনড্রোম বিরল হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এমন রোগীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে এবং উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া হলে অনেক রোগীর জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব।




















