একটি দীর্ঘস্থায়ী কাশি থেকে শুরু হয়েছিল অসুস্থতা। কিন্তু সেই সাধারণ উপসর্গই শেষ পর্যন্ত এক কিশোরের জীবনে নিয়ে আসে বড় সংকট। রক্তের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছেলেকে বাঁচাতে দিনের পর দিন হাসপাতালের কক্ষে কাটিয়েছেন এক বাবা। রান্না করেছেন, কাপড় ধুয়েছেন, পরিবারের দায়িত্ব সামলেছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানের পাশে থেকেছেন প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে।
২০২১ সালের অক্টোবরে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে কিশোর ড্যানিশকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তার শরীরে লিম্ফোমা ধরা পড়ার কথা জানান। এটি রক্তের ক্যান্সারের একটি ধরন, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ লসিকাতন্ত্রকে আক্রান্ত করে।
বাবার জন্য ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়
ড্যানিশের বাবা ইরফান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে একাই তিন সন্তানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন, ছেলের রোগ নির্ণয়ের খবর শুনে ভেঙে পড়েন। চিকিৎসাজনিত বিধিনিষেধের কারণে প্রথম দুই দিন ছেলেকে কাছ থেকেও দেখতে পারেননি তিনি।
তবে সংকটের সেই সময়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ছেলেকে একা লড়তে দেবেন না। হাসপাতালে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তরের পর তিনি প্রায় স্থায়ীভাবেই ছেলের পাশে থাকতে শুরু করেন। রোগের কারণে ড্যানিশের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাই বাইরে থেকে আনা খাবার খাওয়ার অনুমতি ছিল না। প্রতিদিন বাড়ি ফিরে রান্না করে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসতেন বাবা।
হাসপাতালই হয়ে ওঠে দ্বিতীয় বাড়ি
সকালে বাড়ির কাজ, কাপড় ধোয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শেষ করে ছেলের জন্য দুপুরের খাবার প্রস্তুত করতেন ইরফান। কিছু সময় হাসপাতালে কাটিয়ে আবার রাতের খাবার রান্নার জন্য বাড়ি ফিরতেন। ভাত, সবজি ও মুরগির মতো পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত নিজ হাতে তৈরি করতেন তিনি।
ড্যানিশ পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, অসংখ্য চিকিৎসা পরীক্ষা ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে পরিচিত একজন মানুষকে পাশে পাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় স্বস্তি। বাবার উপস্থিতিই তাকে সাহস জুগিয়েছে।
চিকিৎসার পথে নতুন আশা
প্রাথমিক চিকিৎসার পরও ড্যানিশের অবস্থা আবার খারাপ হয়ে যায়। পরে তাকে উন্নত ধরনের কোষভিত্তিক রোগপ্রতিরোধ চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে সেই চিকিৎসা ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করে।
চিকিৎসার কারণে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হয়েছিল তাকে। তবে সুস্থতার পথে ফেরার পর নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় মন দেন ড্যানিশ। অতিরিক্ত কোর্স সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়েরও আগে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ করেন তিনি। পরে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির প্রস্তাবও পান।
অন্ধকার সময়ে ভরসা ছিল পরিবার
ছেলের অসুস্থতার কারণে প্রায় তিন বছর কর্মজীবন থেকে দূরে ছিলেন ইরফান। এই দীর্ঘ সময়ে তাকে শক্তি জুগিয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা।
তিনি বলেন, ছেলের সামনে শক্ত থাকার চেষ্টা করলেও অনেক রাতেই হাসপাতালের কক্ষে নীরবে কেঁদেছেন। কিন্তু কখনও আশা হারাননি। তার বিশ্বাস ছিল, ধৈর্য ও ভালোবাসা থাকলে সবচেয়ে কঠিন সময়ও একদিন কেটে যায়।
আজ ড্যানিশ সুস্থ জীবনের পথে এগিয়ে চলেছেন। আর তার এই যাত্রার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে আছে এক বাবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ এবং অবিচল উপস্থিতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















