০৭:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বে ফিলিপাইনের বিপজ্জনক পক্ষপাত: জাতীয় স্বার্থ কোথায়? আয়কর তুলে দিতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান রাজ্যগুলো, বাড়ছে করনীতির বিভাজন ইয়ামাতো: জাপানের যুদ্ধস্মৃতি, প্রযুক্তির গর্ব এবং ফিরে আসা সামরিক শক্তির ছায়া পুঁজির নতুন পর্দা: অর্থনীতি যখন ভূরাজনীতির অস্ত্র লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি আর নেই, মৃত্যুকালে বয়স ৬৮ ভারতের বর্ষা বদলে যাচ্ছে—বৃষ্টি এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয় বাংলাদেশের আনারস যাবে পাকিস্তানে, খুলছে কৃষিপণ্য রফতানির নতুন দুয়ার দেশে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা ৮৬৭ ২ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসায়ীর লিজের জমি দখলের অভিযোগ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দাফন হয়েছে: সালাহউদ্দিন আহমদ

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ৫০ বিলিয়ন ডলারের আইনি লড়াই: ইউকোস মামলা নিয়ে নতুন বইয়ে ক্ষমতা ও ন্যায়বিচারের গল্প

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একসময় পশ্চিমা বিশ্বে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে দেখা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলে যায়। নতুন এক বইয়ে উঠে এসেছে, কীভাবে রাশিয়ার বৃহৎ তেল কোম্পানি ইউকোসের পতন এবং এর মালিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ পুতিনের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে।

লেখক মার্টিন সিক্সস্মিথ তাঁর নতুন বইয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউকোসকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাতের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। বইটি শুধু একটি করপোরেট বিরোধের কাহিনি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, ব্যবসা, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের জটিল সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

ইউকোসের উত্থান ও পতন

দুই হাজার সালের শুরুতে ইউকোস ছিল রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তেল কোম্পানি। কোম্পানিটির প্রধান মিখাইল খোদোরকোভস্কি ছিলেন দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী ব্যবসায়ীদের একজন। কিন্তু তিনি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন দিতে শুরু করলে এবং জাতীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়।

U.S. judge says Russia can't delay $50 bln Yukos case, citing sanctions |  Reuters

পরবর্তী সময়ে ইউকোসের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়। খোদোরকোভস্কিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং কোম্পানির সম্পদ ধাপে ধাপে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো।

আন্তর্জাতিক আদালতে দীর্ঘ লড়াই

ইউকোসের সাবেক শেয়ারহোল্ডাররা প্রথমে সমঝোতার পথ খুঁজলেও শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে নামেন। এই লড়াইয়ের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন কর আইন বিশেষজ্ঞ টিম ওসবোর্ন।

বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালত ও সালিশি প্রতিষ্ঠানে মামলা পরিচালনার পর তারা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায় নিজেদের পক্ষে আনতে সক্ষম হন। তবে সবচেয়ে আলোচিত রায় আসে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত থেকে।

আদালতে যুক্তি দেওয়া হয়, রাশিয়া শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। শুনানি শেষে সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে ৫০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। এটি আন্তর্জাতিক সালিশি ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ক্ষতিপূরণের রায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

Russia gets partial win in $50-billion case over Yukos - The Economic Times

ক্ষতিপূরণ আদায়ে নতুন অধ্যায়

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও একাধিক আপিলের পর রাশিয়ার জন্য রায় বাতিলের সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে আসে। ফলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে রুশ সম্পদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পথ আরও উন্মুক্ত হয়।

তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়া এই ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করেনি। কিছু সীমিত সম্পদ জব্দ করা গেলেও পুরো অর্থ আদায়ের পথ এখনও কঠিন এবং দীর্ঘ।

তবু লেখকের মতে, এই মামলার গুরুত্ব কেবল আর্থিক নয়। এটি দেখিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা কখনও কখনও শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে।

অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে

বইটিতে ইউকোস সংকটের নানা দিক বিশ্লেষণ করা হলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়ার পরও কেন খোদোরকোভস্কি রাশিয়া ত্যাগ করেননি, তা আজও বিতর্কের বিষয়।

এটি কি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ছিল, নাকি তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে আইনের শাসন শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করবে— সে প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।

তবে বইটির মূল বার্তা স্পষ্ট। রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত পরিবেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে এবং ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াই কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, ইউকোস মামলা তারই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বে ফিলিপাইনের বিপজ্জনক পক্ষপাত: জাতীয় স্বার্থ কোথায়?

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ৫০ বিলিয়ন ডলারের আইনি লড়াই: ইউকোস মামলা নিয়ে নতুন বইয়ে ক্ষমতা ও ন্যায়বিচারের গল্প

০১:১২:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একসময় পশ্চিমা বিশ্বে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে দেখা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলে যায়। নতুন এক বইয়ে উঠে এসেছে, কীভাবে রাশিয়ার বৃহৎ তেল কোম্পানি ইউকোসের পতন এবং এর মালিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ পুতিনের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে।

লেখক মার্টিন সিক্সস্মিথ তাঁর নতুন বইয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউকোসকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাতের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। বইটি শুধু একটি করপোরেট বিরোধের কাহিনি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, ব্যবসা, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের জটিল সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

ইউকোসের উত্থান ও পতন

দুই হাজার সালের শুরুতে ইউকোস ছিল রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তেল কোম্পানি। কোম্পানিটির প্রধান মিখাইল খোদোরকোভস্কি ছিলেন দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী ব্যবসায়ীদের একজন। কিন্তু তিনি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন দিতে শুরু করলে এবং জাতীয় রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়।

U.S. judge says Russia can't delay $50 bln Yukos case, citing sanctions |  Reuters

পরবর্তী সময়ে ইউকোসের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়। খোদোরকোভস্কিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং কোম্পানির সম্পদ ধাপে ধাপে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো।

আন্তর্জাতিক আদালতে দীর্ঘ লড়াই

ইউকোসের সাবেক শেয়ারহোল্ডাররা প্রথমে সমঝোতার পথ খুঁজলেও শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে নামেন। এই লড়াইয়ের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন কর আইন বিশেষজ্ঞ টিম ওসবোর্ন।

বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালত ও সালিশি প্রতিষ্ঠানে মামলা পরিচালনার পর তারা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায় নিজেদের পক্ষে আনতে সক্ষম হন। তবে সবচেয়ে আলোচিত রায় আসে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত থেকে।

আদালতে যুক্তি দেওয়া হয়, রাশিয়া শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। শুনানি শেষে সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে ৫০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। এটি আন্তর্জাতিক সালিশি ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ক্ষতিপূরণের রায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

Russia gets partial win in $50-billion case over Yukos - The Economic Times

ক্ষতিপূরণ আদায়ে নতুন অধ্যায়

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও একাধিক আপিলের পর রাশিয়ার জন্য রায় বাতিলের সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে আসে। ফলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে রুশ সম্পদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পথ আরও উন্মুক্ত হয়।

তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়া এই ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করেনি। কিছু সীমিত সম্পদ জব্দ করা গেলেও পুরো অর্থ আদায়ের পথ এখনও কঠিন এবং দীর্ঘ।

তবু লেখকের মতে, এই মামলার গুরুত্ব কেবল আর্থিক নয়। এটি দেখিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা কখনও কখনও শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিতে পারে।

অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে

বইটিতে ইউকোস সংকটের নানা দিক বিশ্লেষণ করা হলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়ার পরও কেন খোদোরকোভস্কি রাশিয়া ত্যাগ করেননি, তা আজও বিতর্কের বিষয়।

এটি কি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ছিল, নাকি তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে আইনের শাসন শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করবে— সে প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।

তবে বইটির মূল বার্তা স্পষ্ট। রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত পরিবেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে এবং ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াই কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, ইউকোস মামলা তারই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।