নবম শতকের শেষ দিকে উত্তর ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আনেন নরওয়ের রাজা হারাল্ড ফাইনহেয়ার। সমুদ্রপথে শক্তিশালী ভাইকিং বাহিনী গড়ে তুলে তিনি শুধু নিজের শাসন সুসংহত করেননি, বরং উত্তর আটলান্টিকের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জ অর্কনি ও শেটল্যান্ডও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই পদক্ষেপই পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে স্কটল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে নর্স প্রভাবের ভিত্তি তৈরি করে।
উত্তর সাগরের ওপারে কৌশলগত লক্ষ্য
হারাল্ড ফাইনহেয়ার হাফরসফিয়র্ডের যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে নরওয়ের বড় অংশকে একত্রিত করেছিলেন। তবে তার পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকেই দেশ ছেড়ে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের উত্তরাঞ্চলে আশ্রয় নেয়। অর্কনি, শেটল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোকে ঘাঁটি বানিয়ে তারা নরওয়ের উপকূলে হামলা ও লুটপাট চালাতে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে হারাল্ড শুধু প্রতিশোধ নিতেই সমুদ্রযাত্রা করেননি; তার সামনে ছিল আরও বড় কৌশলগত লক্ষ্য। অর্কনি ও শেটল্যান্ড দখল করতে পারলে উত্তর সাগর ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের মাঝখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতো।
‘পশ্চিম সাগর’ ধারণা
আজ যাকে আমরা উত্তর সাগর বলি, নর্সদের কাছে সেটিই ছিল ‘পশ্চিম সাগর’। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই অর্কনি ও শেটল্যান্ডকে তারা পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জ হিসেবে দেখত। এই ভৌগোলিক ধারণা শুধু নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা তাদের বিশ্বদর্শনেরও অংশ ছিল।
নর্স নাবিকদের জন্য এই দ্বীপগুলো ছিল নরওয়ে থেকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার স্বাভাবিক সেতুবন্ধন। ফলে অঞ্চলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা ছিল সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভাইকিং অভিযানের কেন্দ্র
প্রায় ৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে হারাল্ড বিদ্রোহীদের দমন করেন এবং অর্কনি ও শেটল্যান্ডকে নিজের শাসনের আওতায় আনেন। এই দ্বীপগুলো থেকে ভাইকিংরা ব্রিটেনের পূর্ব উপকূল, পিক্টদের ভূখণ্ড, অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজ্য এবং আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজেই অভিযান পরিচালনা করতে পারত।
অর্কনি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এখান থেকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় দিকেই দ্রুত নৌবহর পাঠানো সম্ভব ছিল। ফলে এটি ভাইকিং শক্তির অন্যতম প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
নতুন শাসনের সূচনা
অভিযান শেষে নরওয়েতে ফিরে গিয়ে হারাল্ড দ্বীপগুলোর শাসনভার একজন বিশ্বস্ত আর্লের হাতে তুলে দিতে চান। প্রথমে তিনি মোর অঞ্চলের আর্ল রগনভাল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু নিজস্ব অঞ্চল পরিচালনার ব্যস্ততার কারণে রগনভাল্ড দায়িত্বটি নিজের ভাই সিগুর্ড আইস্টেইনসনের কাছে হস্তান্তর করেন।
সিগুর্ড ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও সম্মানিত নর্স যোদ্ধা। তার নেতৃত্বে অর্কনি ও শেটল্যান্ডে নর্স শাসন আরও সুসংহত হয় এবং অঞ্চলটি দীর্ঘ সময় ধরে ভাইকিং সংস্কৃতি ও ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে টিকে থাকে।
উত্তরাধিকার আজও দৃশ্যমান
শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও অর্কনি ও শেটল্যান্ডে নর্স ঐতিহ্যের ছাপ আজও স্পষ্ট। স্থাননাম, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং স্থানীয় সংস্কৃতির নানা উপাদানে সেই ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা যায়। স্কটল্যান্ডের অংশ হলেও এই দ্বীপগুলো এখনও তাদের ভাইকিং অতীতের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক বহন করে চলেছে।
স্কটল্যান্ডের অর্কনি ও শেটল্যান্ড কীভাবে ভাইকিংদের শেষ শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল এবং কেন এগুলো নরওয়ের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















