জীবনের কিছু মুহূর্ত মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার কিছু মুহূর্ত তাকে নতুন করে গড়ে তোলে। এক তরুণ উদ্যোক্তার জীবনে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা এমনই এক ঘটনা, যা তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই পরে তাকে আরও দৃঢ়, আরও সাহসী করে তোলে।
দুঃসাহসিক উড্ডয়নের শুরু
২০২০ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের এক গ্রামীণ এলাকায় একটি ছোট এক আসনের উড়ন্ত যান নিয়ে আকাশে ওঠেন লিডিয়া উইঙ্কলার। এটি ছিল তার জীবনের প্রথম একক উড্ডয়ন। মহামারির দীর্ঘ বন্দিদশার পর মুক্ত আকাশে উড়ে যাওয়ার অনুভূতি তাকে রোমাঞ্চিত করেছিল।
প্রথম কয়েক মিনিট সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। হাজার ফুট ওপরে উঠে তিনি স্বাধীনতার এক অনন্য স্বাদ অনুভব করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যায়। উড়ন্ত যানের ওপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেতে শুরু করে। যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত রেডিওও কাজ করছিল না।
মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই
কিছুক্ষণের মধ্যেই যানটি একটি লম্বা গাছের ডালে গিয়ে আটকে যায়। মাটির প্রায় ১১০ ফুট ওপরে উল্টো হয়ে ঝুলে পড়েন তিনি। দুর্ঘটনার ধাক্কা থেকে বেঁচে গেলেও নতুন বিপদ অপেক্ষা করছিল।
যানের ইঞ্জিন থেকে জ্বালানি বের হয়ে তার শরীরের ওপর পড়তে থাকে। চোখ, মুখ, হাত ও শরীরজুড়ে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। তবু তিনি জানতেন, নিরাপত্তা বেল্ট খুললে সরাসরি নিচে পড়ে যেতে হবে।
নিচে একের পর এক উদ্ধারকারী দল আসে। দমকলের মই, হেলিকপ্টার, এমনকি বড় ক্রেনও আনা হয়। কিন্তু কেউই তার কাছে পৌঁছাতে পারছিল না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা ও আতঙ্কও বাড়তে থাকে।
আশা হারাননি
গাছে ঝুলে থাকা অবস্থায় তিনি বারবার নিজের প্রিয় কুকুরটির কথা ভাবছিলেন। সেই স্মৃতিই তাকে বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়েছিল। নিচে থাকা সহকর্মীরাও তাকে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছিলেন।
প্রায় সাত ঘণ্টা পর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গাছ আরোহীদের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তাদের একজন বিপজ্জনকভাবে ওপরে উঠে তাকে নিরাপত্তা বেল্ট পরিয়ে উদ্ধার করেন।
চিকিৎসকরা পরে জানান, তার শরীরে মারাত্মক দগদগে ক্ষত তৈরি হলেও আশ্চর্যজনকভাবে কোনো হাড় ভাঙেনি বা অভ্যন্তরীণ গুরুতর আঘাত লাগেনি।
দ্বিতীয়বার আকাশে ফেরা
দুর্ঘটনার পর সুস্থ হতে সময় লেগেছিল। প্রতিটি দিন ছিল যন্ত্রণাময়। তবে তার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরছিল—তিনি উড়েছিলেন, কিন্তু নিরাপদে অবতরণ করতে পারেননি।
অবশেষে দুর্ঘটনার মাত্র ৭২ দিন পর তিনি আবারও একই ধরনের উড়ন্ত যানে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের ভয়কে জয় করতে চেয়েছিলেন।
দ্বিতীয়বারের উড্ডয়নে সবকিছু সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়। কয়েক মিনিট আকাশে থাকার পর তিনি ধীরে ধীরে নিচে নামেন এবং একটি খোলা মাঠে সফলভাবে অবতরণ করেন।
জীবনের বড় শিক্ষা
এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, ভয়কে এড়িয়ে নয়, বরং তার মুখোমুখি হয়েই জয় করতে হয়। কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষের প্রতি আস্থা রাখা, প্রিয়জনদের কথা মনে রাখা এবং প্রতিকূলতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তার ভাষায়, জীবন যতই কঠিন হোক না কেন, প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
দুর্ঘটনার পর ১১০ ফুট উঁচু গাছে সাত ঘণ্টা ঝুলে থেকেও হার মানেননি এক নারী। মৃত্যুকে হারিয়ে আবারও আকাশে ফিরেছেন তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















