বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, যুদ্ধ, উপনিবেশবাদ এবং মানবিক ট্র্যাজেডিকে এক সুতোয় গেঁথে নতুন উপন্যাস ‘রেড সোর্ড’ পাঠকদের সামনে হাজির করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার আলোচিত লেখক বোরা চুং। বইটি যেমন সাহসী, তেমনি অনেক পাঠকের কাছে বিভ্রান্তিকরও মনে হতে পারে। তবে এই দুর্বোধ্যতাই কি বইটির মূল শক্তি—সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার বিষয়।
উপনিবেশ, যুদ্ধ ও বন্দিত্বের গল্প
‘রেড সোর্ড’-এর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে একটি বিতর্কিত গ্রহকে ঘিরে। সেখানে ক্রিসনা নামে এক নারী, যিনি একই সঙ্গে দাস ও যোদ্ধা, উপনিবেশবাদী শাসকদের হয়ে এক রহস্যময় শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হন। শত্রুদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘সাদা এলিয়েন’ হিসেবে।
গল্পজুড়ে রয়েছে যুদ্ধ, বন্দিত্ব, পালিয়ে যাওয়া ও পুনরায় ধরা পড়ার ঘটনা। পাশাপাশি আছে ক্লোন, স্মৃতির পুনরুৎপাদন এবং মানুষের পরিচয় সংকটের মতো জটিল বিষয়। এসব উপাদান মিলিয়ে উপন্যাসটি প্রচলিত ধারার বিজ্ঞান কল্পকাহিনি থেকে আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
অন্যরকম লেখনশৈলী
বোরা চুংয়ের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর চরিত্র নির্মাণের ধরন। উপন্যাসের চরিত্ররা নানা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেও তাদের আবেগ প্রকাশ অনেক সময় সংযত ও সংক্ষিপ্ত। ফলে পাঠকের কাছে চরিত্রগুলো বাস্তবের মানুষের চেয়ে যেন প্রতীকে পরিণত হয়।
আহত সৈনিক, বন্দি যোদ্ধা কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া মানুষ—সবাইকে লেখক এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা প্রচলিত আবেগঘন বর্ণনার বিপরীত। এতে অনেকের কাছে গল্পের গতি একঘেয়ে মনে হলেও অন্যদিকে এটি যুদ্ধ ও নিপীড়নের মানসিক শূন্যতাকে তুলে ধরার একটি সচেতন সাহিত্যিক কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
যুদ্ধের ট্রমা ও পরিচয়ের সংকট
উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে যুদ্ধের মানসিক ক্ষত এবং ক্ষমতাশালী শাসকদের হয়ে লড়াই করতে বাধ্য হওয়া মানুষের দুর্ভাগ্য। চরিত্রগুলো যেন নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা মানুষ, যারা বারবার একই সহিংসতার চক্রে আটকে যায়।
বইটিতে ব্যক্তি পরিচয়ের চেয়ে গোষ্ঠীগত পরিচয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অনেক চরিত্রের নামও রঙ বা চিহ্নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে মানবিক সম্পর্কের বদলে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামই গল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
সব পাঠকের জন্য নয়
‘রেড সোর্ড’ সহজপাঠ্য উপন্যাস নয়। এর পুনরাবৃত্তিমূলক গঠন, সংযত ভাষা এবং ব্যতিক্রমী বর্ণনাভঙ্গি অনেক পাঠকের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে পারে। তবে যারা নতুন ধরনের সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কল্পবিজ্ঞান এবং সামাজিক-রাজনৈতিক রূপকের প্রতি আগ্রহী, তাদের জন্য বইটি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
বোরা চুং ইতোমধ্যে কল্পনা, সমাজব্যবস্থা, বৈষম্য এবং ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে ভিন্নধর্মী লেখার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছেন। ‘রেড সোর্ড’ সেই ধারারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংক্ষিপ্ত অথচ সাহসী উপন্যাস ‘রেড সোর্ড’ যুদ্ধ, উপনিবেশবাদ ও পরিচয় সংকটকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















