ব্রিটেনে বিবিসিকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু এবার যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মৌলিক: ডিজিটাল যুগে একটি জনসেবামূলক গণমাধ্যমকে কীভাবে অর্থায়ন করা হবে? আর সেই অর্থায়নের ভার বহন করবে কারা?
দশকের পর দশক ধরে বিবিসি ব্রিটিশ জনজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য প্রতিষ্ঠান। সংবাদ থেকে শুরু করে নাটক, ডকুমেন্টারি, রেডিও অনুষ্ঠান কিংবা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সম্প্রচার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর উপস্থিতি স্পষ্ট। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং দর্শকের অভ্যাসের আমূল রূপান্তর এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে পুরোনো অর্থায়ন কাঠামো আর আগের মতো কার্যকর বলে মনে হচ্ছে না।

আজকের ব্রিটেনে মানুষ ক্রমশ প্রচলিত টেলিভিশন ছেড়ে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ভিডিওর দিকে ঝুঁকছে। নেটফ্লিক্স, ডিজনি+, ইউটিউব বা টিকটক বহু মানুষের প্রধান বিনোদন ও তথ্যের উৎস হয়ে উঠেছে। অথচ বিবিসির অর্থায়নের কেন্দ্রে এখনও রয়েছে সেই লাইসেন্স ফি ব্যবস্থা, যা মূলত লাইভ টেলিভিশন দেখা বা বিবিসির আইপ্লেয়ার ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানেই বিবিসির উদ্বেগ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা কার্যত একটি সর্বজনীন সেবা প্রদান করে, কিন্তু তাদের অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি আর সর্বজনীন নয়। কোটি কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে বিবিসির কনটেন্ট ব্যবহার করলেও সবাই লাইসেন্স ফি দেয় না। ফলে জনসেবার দায়িত্ব বহাল থাকলেও আয়ের ভিত্তি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

এই আর্থিক চাপ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। কর্মী ছাঁটাই, অনুষ্ঠান বন্ধ, উৎপাদন ব্যয় কমানো—সবই সংকটের লক্ষণ। বিবিসি এখনও বিশাল আকারের একটি প্রতিষ্ঠান, এবং সমালোচকদের মতে, ব্যয় সংকোচনের আরও সুযোগ রয়েছে। তাদের যুক্তি, পরিবর্তিত মিডিয়া বাজারে বিবিসির উচিত নিজের পরিধি ও কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা, নতুন অর্থ দাবি করার আগে নিজস্ব দক্ষতা বাড়ানো।
তবে বিবিসির ভেতরে ও ব্রিটিশ সম্প্রচার খাতের একটি অংশে অন্য ধরনের চিন্তা জোর পাচ্ছে। তাদের মতে, যদি নাগরিকদের বড় অংশ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এবং সেখানেই সময় ব্যয় করে, তাহলে জনসেবামূলক সম্প্রচারের অর্থায়নের দায়ও আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ হওয়া উচিত। সেই চিন্তা থেকেই উঠে এসেছে বিতর্কিত প্রস্তাব—স্ট্রিমিং সেবার গ্রাহকদেরও লাইসেন্স ফি কাঠামোর আওতায় আনা।
ধারণাটি প্রথম শুনলে অদ্ভুত মনে হতে পারে। কেউ যদি কখনো বিবিসি না দেখে, কেবল নেটফ্লিক্স বা টিকটকে সময় কাটায়, তাহলে কেন তাকে বিবিসির জন্য অর্থ দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিতর্কটি কেবল গণমাধ্যমের নয়, বরং জনসেবার দর্শনের প্রশ্নে গিয়ে দাঁড়ায়।
সমর্থকদের যুক্তি হলো, বিবিসি কেবল একটি চ্যানেল নয়; এটি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। যেমন রাস্তা, গ্রন্থাগার বা গণপরিষেবা করদাতাদের অর্থে চলে, তেমনি নির্ভরযোগ্য সংবাদ, সাংস্কৃতিক কনটেন্ট এবং শিক্ষামূলক সম্প্রচারও সমাজের সামষ্টিক সম্পদ। তাই প্রত্যক্ষ ব্যবহারই একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।

অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করেন, এই যুক্তি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। ডিজিটাল যুগে মানুষ অভূতপূর্ব মাত্রায় পছন্দের স্বাধীনতা ভোগ করছে। তারা কী দেখবে, কোথায় দেখবে এবং কিসের জন্য অর্থ দেবে—সেসব সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ওপর বিবিসির অর্থায়নের দায় চাপানো জনসমর্থনের সংকট আরও বাড়াতে পারে।
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রাজনৈতিক। বিবিসির রয়্যাল চার্টার নবায়নের সময় ঘনিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু অর্থ নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও চাইছে। ভবিষ্যতে কোনো সরকার যদি বিবিসির ভূমিকা সীমিত করতে চায় বা অর্থায়ন কাঠামো বদলাতে চায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি কতটা সুরক্ষিত থাকবে—সেই প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে বিবিসির প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখা গেলেও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে অর্থায়নের নতুন মডেল খোঁজার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি নিজের অস্তিত্বের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে চাইছে।

তবে শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্নটি অর্থের নয়, আস্থার। ব্রিটিশ জনগণ কি এখনও বিশ্বাস করে যে বিবিসি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার জন্য সম্মিলিতভাবে অর্থ ব্যয় করা উচিত? যদি সেই বিশ্বাস অটুট থাকে, তাহলে নতুন কোনো অর্থায়ন মডেল হয়তো গ্রহণযোগ্যতা পাবে। কিন্তু যদি জনমনে দূরত্ব বাড়তে থাকে, তাহলে শুধু নতুন কর, নতুন ফি কিংবা নতুন বিজ্ঞাপন প্রচারণা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
ডিজিটাল যুগে বিবিসির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই প্রযুক্তিগত নয়; এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক। প্রতিষ্ঠানটিকে প্রমাণ করতে হবে যে দ্রুত বদলে যাওয়া মিডিয়া পরিবেশেও তার প্রাসঙ্গিকতা আগের মতোই শক্তিশালী। আর সেই প্রমাণের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে টিকটক ব্যবহারকারী হোক বা টেলিভিশন দর্শক—কেউ বিবিসির জন্য অর্থ দিতে রাজি হবে কি না।
উইলিয়াম টারভিল 


















