পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের ঠিক পাশেই বিস্তৃত মারগাল্লা পাহাড়। ব্যস্ত নগরজীবনের এত কাছে যে একটি সুস্থ চিতাবাঘের আবাস গড়ে উঠতে পারে, তা একসময় অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে প্রমাণ মিলেছে, এই পাহাড় শুধু চিতাবাঘের বিচরণভূমিই নয়, বরং তাদের স্থায়ী আবাসস্থল।
২০১৮ সালে মারগাল্লা পাহাড়ের একটি ট্রেইলে একটি পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘের খুলি উদ্ধার হওয়ার পর বিষয়টি নতুনভাবে গুরুত্ব পায়। পরে বিভিন্ন নমুনা, পদচিহ্ন এবং ক্যামেরা ফাঁদের ছবিতে একের পর এক প্রমাণ সামনে আসে। এতে স্পষ্ট হয়, বহুদিন ধরেই এসব পাহাড়ে চিতাবাঘের বসবাস রয়েছে।
গুজব থেকে বাস্তবতা
স্থানীয় বাসিন্দারা বহু বছর ধরে পাহাড়ে চিতাবাঘ দেখার দাবি করে আসছিলেন। তবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাবে বিষয়টি গুজব হিসেবেই থেকে যায়। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে যখন বন্যপ্রাণী রক্ষায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা পাহাড়জুড়ে অনুসন্ধান শুরু করেন।

পদচিহ্ন, বিষ্ঠা এবং বিভিন্ন চিহ্ন সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, এলাকায় সক্রিয় চিতাবাঘ রয়েছে। পরে ক্যামেরা ফাঁদে প্রথমবারের মতো একটি চিতাবাঘের ছবি ধরা পড়ে। এরপর আরও কয়েকটি প্রাণীর উপস্থিতির তথ্য মেলে।
‘শেহজাদি’ নামের সেই চিতাবাঘ
২০২১ সালে একটি ক্যামেরা ফাঁদে ধরা পড়ে এক পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী চিতাবাঘ। তার রাজকীয় চলাফেরা ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কর্মকর্তারা তার নাম দেন ‘শেহজাদি’ বা রাজকন্যা।
পরে একই এলাকায় আরও দুটি চিতাবাঘের ছবি ধরা পড়ে। তাদের নাম রাখা হয় ‘শেহজাদা’ এবং ‘সুলতান’। এই তিন প্রাণীর উপস্থিতি রাজধানীর বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।
গবেষণায় দেখা যায়, তারা কেবল পাহাড়ে অস্থায়ীভাবে আসে না; বরং এখানেই নিজেদের এলাকা নির্ধারণ করে বসবাস করে।
চার বছরের গবেষণায় চমক

২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক বিস্তৃত গবেষণায় পুরো জাতীয় উদ্যানকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে ২০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। হাজারো ঘণ্টার ভিডিও ও ছবির বিশ্লেষণে অন্তত সাতটি পৃথক চিতাবাঘের অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
গবেষকরা তাদের শরীরের বিশেষ দাগের নকশা বিশ্লেষণ করে আলাদা প্রাণীগুলোকে শনাক্ত করেন। এতে নিশ্চিত হয় যে মারগাল্লা পাহাড়ে একটি সক্রিয় ও প্রজননক্ষম চিতাবাঘের জনসংখ্যা রয়েছে।
মানুষের সঙ্গে সংঘাত কতটা?
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ ও চিতাবাঘের সংঘাতের বহু ঘটনা রয়েছে। কিন্তু মারগাল্লা পাহাড়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।
গবেষণায় দেখা গেছে, এখানকার চিতাবাঘ মানুষের ওপর হামলার কোনো রেকর্ড তৈরি করেনি। স্থানীয় গ্রামগুলোতেও প্রাণঘাতী আক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়নি। মাঝে মাঝে গবাদিপশুর ক্ষতির অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিতাবাঘ সাধারণত লাজুক ও একাকী স্বভাবের প্রাণী। তারা মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতেই বেশি পছন্দ করে।
বড় হুমকি মানুষই

যেখানে চিতাবাঘ মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে ওঠেনি, সেখানে মানুষের কর্মকাণ্ডই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি চিতাবাঘের মৃত্যু উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা, রহস্যজনক মৃত্যু এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবৈধ শিকার ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সংরক্ষণের নতুন উদ্যোগ
চিতাবাঘের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে ২০২২ সালে পাহাড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রেইল সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়। সেখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিতাবাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়; পুরো বনজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের উপস্থিতি বন্য শূকর, সজারু ও অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
রাজধানীর পাশেই এমন একটি সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণ পরিবেশ টিকে থাকা বিশ্বে বিরল ঘটনা। তাই এই প্রাণীদের রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রজাতিকে বাঁচানো নয়, বরং পুরো একটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে সংরক্ষণ করা।










সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















