ভারতের জনপ্রিয় ক্রীড়াধর্মী বহুমুখী যান মাহিন্দ্রা থার একসময় ছিল শক্তিশালী নকশা, দুর্গম পথে চলার সক্ষমতা এবং সাহসী অভিযানের প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গাড়ির পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে গেছে আরেকটি বিতর্কিত পরিচয়—বেপরোয়া চালনা, সড়কে দাদাগিরি এবং জননিরাপত্তার প্রতি অবহেলা। ফলে অনেক সাধারণ পথচারী ও অন্যান্য গাড়িচালকের কাছে থার এখন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে।
জনপ্রিয়তার সঙ্গে বেড়েছে বিতর্ক
ভারতে এমনিতেই ট্রাফিক আইন মানার সংস্কৃতি দুর্বল বলে সমালোচনা রয়েছে। এই বাস্তবতায় বড় আকারের শক্তিশালী গাড়ি অনেকের কাছে প্রভাব বিস্তারের একটি উপায় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মাহিন্দ্রা থারকে ঘিরে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এর কিছু চালক সড়কে অন্যদের ভয় দেখিয়ে চলেন, নিয়ম ভাঙেন এবং বেপরোয়া কসরত করে নিজেদের প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থারকে ঘিরে অসংখ্য ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও দেখা যায়, একটি থার ভুল দিক দিয়ে দ্রুতগতিতে এসে সারি সারি মোটরসাইকেল ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে। আবার কোথাও চালক পথচারীদের দিকে গাড়ি ছুটিয়ে শেষ মুহূর্তে ব্রেক করছেন। আরও উদ্বেগজনক কিছু ঘটনায় পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যাওয়া কিংবা মোটরসাইকেল আরোহীকে আঘাত করার পর আবার গাড়ি পেছনে নিয়ে দ্বিতীয়বার ধাক্কা দেওয়ার মতো অভিযোগও উঠে এসেছে।
সাফল্যের আড়ালে নতুন সংকট
২০১০ সালে প্রথম বাজারে আসার পর থেকেই মাহিন্দ্রা থার ধীরে ধীরে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় এসইউভিতে পরিণত হয়। ২০২০ সালে দ্বিতীয় প্রজন্মের মডেল আসার পর এর বিক্রি আরও বাড়ে। ২০২৫ সালে গাড়িটির বিক্রি তিন লাখের মাইলফলক অতিক্রম করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থারের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর তুলনামূলক কম দাম। অন্যান্য বড় এসইউভির তুলনায় অনেক কম মূল্যে এটি কেনা সম্ভব হওয়ায় বহু নতুন ক্রেতা প্রথম এসইউভি হিসেবে থার বেছে নিচ্ছেন। তবে এর মধ্যেই এমন কিছু চালক রয়েছেন, যাদের পর্যাপ্ত দক্ষতা বা দায়িত্ববোধ নেই। ফলে শক্তিশালী এই গাড়ি অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
‘জিম করা তরুণ’ স্টেরিওটাইপ
ভারতের জ্যেষ্ঠ মোটরগাড়ি বিশ্লেষকদের মতে, থারকে ঘিরে একটি সামাজিক ধারণা তৈরি হয়েছে। অনেকের চোখে এটি এমন তরুণদের গাড়ি, যারা নতুন অর্থসম্পদ অর্জনের পর নিজেদের ক্ষমতা বা পৌরুষ প্রদর্শনের প্রতীক হিসেবে এই গাড়ি কেনেন।
গাড়িটির আকর্ষণীয় নকশা এবং সড়কে সহজে নজরে পড়ার কারণে থার জড়িত নেতিবাচক ঘটনাগুলোও দ্রুত মানুষের দৃষ্টিতে আসে। ফলে একের পর এক ঘটনা এই নেতিবাচক ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
প্রশাসনেরও উদ্বেগ
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও থারকে ঘিরে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গোয়া সরকার ভাড়ায় ব্যবহৃত নতুন থারের লাইসেন্স সীমিত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। কারণ, পর্যটন এলাকায় এই গাড়িকে ঘিরে দুর্ঘটনা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্টের অভিযোগ বেড়েছে।
অন্যদিকে হরিয়ানার এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, কিছু অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি থার ও ভারী মোটরসাইকেল বেশি ব্যবহার করেন। এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক থার মালিক প্রতিবাদ জানান এবং কেউ কেউ আইনি নোটিশও পাঠান। তাদের বক্তব্য, কয়েকজনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের জন্য সব মালিককে একই চোখে দেখা অন্যায়।
মালিকরাও বদলাচ্ছেন সিদ্ধান্ত
থারের ভাবমূর্তি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, কিছু দায়িত্বশীল মালিকও অস্বস্তি অনুভব করছেন। এমনই একজন ভারতীয় সাংবাদিক, যিনি বহু বছর থার ব্যবহার করার পর শেষ পর্যন্ত গাড়িটি বিক্রি করে দেন। তার ভাষায়, আগে থার ছিল অভিযানের গাড়ি; পরে এটি এমন মানুষের প্রতীক হয়ে ওঠে, যারা শুধু শক্তি প্রদর্শন ও সড়কে অন্যদের ভয় দেখাতে এটি ব্যবহার করেন। সেই পরিচয়ের অংশ হতে না চেয়েই তিনি অন্য একটি অফ-রোড গাড়ি কিনেছেন।
ভাবমূর্তি ফেরাতে উদ্যোগ
থারকে ঘিরে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা কাটাতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। পরিবারবান্ধব পাঁচ দরজার সংস্করণ বাজারে আনা হয়েছে এবং ইতিবাচক ভাবমূর্তির একজন জনপ্রিয় অভিনেতাকে ব্র্যান্ড দূত করা হয়েছে। পাশাপাশি দায়িত্বশীল চালকেরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছেন যে, সব থার মালিকই বেপরোয়া নন।
তবু বাস্তবতা হলো, বহু মানুষের মনে এখনও থার দেখলেই সতর্ক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়ে গেছে। একটি গাড়ির প্রকৃত সক্ষমতার চেয়ে তার ব্যবহারকারীদের আচরণই কীভাবে জনমনে স্থায়ী ধারণা তৈরি করতে পারে, মাহিন্দ্রা থারের বর্তমান অবস্থাই তার অন্যতম বড় উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















