যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কর্মক্ষেত্রে আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের লড়াই ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নর্থ ডাকোটায় পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক যে আহত শ্রমিকদের পক্ষে মামলা লড়তে বর্তমানে মাত্র দুইজন আইনজীবী রয়েছেন। তারাও অবসরের কাছাকাছি। ফলে বহু শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
দুর্ঘটনার পর শুরু দীর্ঘ সংগ্রাম
২০২০ সালে নর্থ ডাকোটার ফার্গো শহরে একটি দোকানে পণ্য সরবরাহ করতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গুরুতর আহত হন ওক রেইলে। দুর্ঘটনায় তার মেরুদণ্ডের দুটি কশেরুকা ভেঙে যায় এবং বগলের নিচ থেকে পুরো শরীর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়।
দীর্ঘ হাসপাতাল ও পুনর্বাসন শেষে তিনি তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন। চিকিৎসকের পরামর্শে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিলেও রাজ্যের কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ সংস্থা তার সেই চিকিৎসার খরচ বহন করতে অস্বীকৃতি জানায়। সংস্থার দাবি ছিল, বিষণ্নতা তার শারীরিক আঘাতের প্রত্যক্ষ শারীরবৃত্তীয় ফল নয়।
এরপর রেইলে ও তার স্ত্রী আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তখনই তারা জানতে পারেন, আহত শ্রমিকদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করার মতো আইনজীবী রাজ্যে প্রায় নেই বললেই চলে।
কেন কমে যাচ্ছে এই আইনজীবী?
শ্রমিক ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলায় আগ্রহী আইনজীবীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ক্ষতিপূরণ ও সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মামলা জিতলেও আইনজীবীদের পারিশ্রমিকের ওপর কঠোর সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ এসব মামলা তরুণ আইনজীবীদের কাছে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় থাকছে না।
অভিজ্ঞ আইনজীবীরা একে একে অবসরে যাচ্ছেন, কিন্তু তাদের জায়গায় নতুন কেউ আসছেন না। এর ফলে আহত শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদালতে উপস্থাপন করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ব্যবসার খরচ কমলেও বাড়ছে শ্রমিকের দুর্ভোগ
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থায় সংস্কারের ফলে বীমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক চাপ হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ, ছোটখাটো আঘাতের বাইরে গুরুতর দুর্ঘটনায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। চিকিৎসা ব্যয়, আয়ের ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের খরচ অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলছে।
দাবি অনুমোদন হলেও চিকিৎসা নিয়ে বিরোধ
নর্থ ডাকোটার কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা ও বীমা সংস্থা জানিয়েছে, তারা প্রাথমিকভাবে প্রায় ৯০ শতাংশ দাবি অনুমোদন করে এবং অধিকাংশ সেবাগ্রহীতা সন্তুষ্ট। সংস্থাটির মতে, কর্মক্ষেত্র আগের তুলনায় নিরাপদ হওয়ায় দুর্ঘটনার সংখ্যাও কমেছে।
তবে শ্রমিক ও আইনজীবীদের অভিযোগ, প্রথমে দাবি অনুমোদনের পর পরবর্তী চিকিৎসা, পুনর্বাসন কিংবা অতিরিক্ত সুবিধার আবেদন প্রায়ই প্রত্যাখ্যান করা হয়। অনেকেই আপিল করতে চান, কিন্তু আইনজীবী না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন।

সঞ্চয় ভেঙে চলেছে সংসার
ফার্গোর নির্মাণশ্রমিক জেসি জার্গার ২০২৩ সালে কাজের সময় পড়ে গিয়ে কনুই ভেঙে ফেলেন এবং স্থায়ী স্নায়ুক্ষতির শিকার হন। তার কিছু দাবি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি দুইজন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কেউ তার মামলা নিতে রাজি হননি।
শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে তাকে জীবনবিমার অর্থ তুলতে হয় এবং পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে ফেলতে হয়।
মাত্র দুই আইনজীবীর কাঁধে শত শত মামলা
নর্থ ডাকোটার দুই কর্মক্ষেত্র ক্ষতিপূরণ আইনজীবীর একজন ড্যান ফিলিপস জানান, প্রতি সপ্তাহে ২৫টিরও বেশি নতুন ফোনকল পান তিনি। কিন্তু সময় ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতি ছয়টি আবেদনের মধ্যে মাত্র একটি মামলা গ্রহণ করতে পারেন।
তার মতে, বর্তমান পারিশ্রমিক কাঠামো অনুযায়ী এসব মামলা পরিচালনা করা আর্থিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।
সুপ্রিম কোর্টে জয়, পরে বদলে গেল আইন
ওক রেইলের মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার ব্যয় বহনের দাবিতে ড্যান ফিলিপস মামলাটি নর্থ ডাকোটা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হন।
কিন্তু সেই রায়ের অল্প সময় পরই আইন সংশোধন করে এমন বিধান আনা হয়, যাতে ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনার মানসিক প্রভাবের চিকিৎসা ব্যয় দাবি করার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যায়।
ফিলিপস জানান, এত দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের জন্য তিনি যে পারিশ্রমিক পেয়েছেন, তা তার প্রকৃত শ্রমের প্রায় অর্ধেকের সমান।
কর্মক্ষেত্রে আহত শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা একসময় আর্থিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভরসা হিসেবে বিবেচিত হলেও, আইনজীবীর সংকট এবং কঠোর বিধিনিষেধের কারণে অনেকের জন্য সেই সুরক্ষা এখন ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















