যুদ্ধের ইতিহাসে শিশুদের মৃত্যু নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু কিছু ঘটনা কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকে না; সেগুলো সভ্যতার বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। গাজার পাঁচ বছরের শিশু হিন্দ রাজাবের গল্প তেমনই একটি ঘটনা। এটি শুধু একটি শিশুর মৃত্যুর কাহিনি নয়, বরং এমন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে জীবন রক্ষার চেয়ে নিয়ন্ত্রণ, অনুমতি ও শক্তির প্রদর্শন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হিন্দ রাজাবের শেষ কয়েক ঘণ্টার অভিজ্ঞতা বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে গভীর নাড়া দিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গাড়িতে পালিয়ে যাওয়ার সময় হামলার মুখে পড়ে সে। মুহূর্তেই চারপাশে মৃত্যু নেমে আসে। পরিবারের প্রায় সবাই নিহত হন। জীবিত থাকে শুধু কয়েকজন শিশু। তাদের একজন ছিল হিন্দ। সে একটি গুলিবিদ্ধ গাড়ির ভেতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে ছিল, আর অন্য প্রান্তে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের জরুরি সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীরা তাকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক শুধু হামলা নয়; বরং উদ্ধার প্রচেষ্টার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া। কাছাকাছি একটি অ্যাম্বুলেন্স কয়েক মিনিটের দূরত্বে থাকলেও সেটিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রয়োজন ছিল নিরাপদ পথের অনুমতি। সেই অনুমতি পেতে দীর্ঘ সময় কেটে যায়। ফোনের ওপারে একটি শিশু বারবার সাহায্য চাইছে, আর অন্য প্রান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা অসহায়ের মতো অপেক্ষা করছেন প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য। এখানে প্রশ্নটি শুধু সামরিক সিদ্ধান্তের নয়; এটি মানবিকতার সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সংঘর্ষের প্রশ্ন।

গাজার বাস্তবতা বোঝার জন্য এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট। সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন বহুস্তরীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছে। চলাচল, চিকিৎসা, খাদ্য, আশ্রয়—সবকিছুই অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুধু গোলাবারুদের বিরুদ্ধে নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও, যা জরুরি পরিস্থিতিকেও কাগজপত্র ও অনুমোদনের গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়।
হিন্দের গল্প আরেকটি সত্যও সামনে আনে। যুদ্ধের খবর আমরা সাধারণত সামরিক অভিযান, ভূরাজনীতি বা কূটনৈতিক বিবৃতির ভাষায় শুনি। কিন্তু সংঘাতের প্রকৃত মূল্য চুকান সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশুরা। তারা কোনো পক্ষ বেছে নেয় না, কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয় না, তবুও তারাই সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয়। একটি শিশু যখন মৃত্যুভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করে, তখন যুদ্ধের সব কৌশলগত ব্যাখ্যা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনের মানুষ একই ধরনের অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতার মধ্যে বসবাস করছে। তাদের বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে, বসতি সংকুচিত হয়েছে, ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ নিয়ে অসংখ্য আলোচনা, প্রস্তাব ও বিবৃতি এসেছে। কিন্তু বাস্তবতার খুব কম পরিবর্তন হয়েছে। ফলে প্রতিটি নতুন ট্র্যাজেডি আগের অসমাপ্ত প্রশ্নগুলোই আবার সামনে নিয়ে আসে।
বিশ্ব রাজনীতির আরেকটি কঠিন সত্য হলো, মানবিক সংকটের প্রতিক্রিয়া প্রায়ই শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার বা মানবিক নীতির কথা বলা হলেও সেগুলোর প্রয়োগ অনেক সময় সমানভাবে হয় না। গাজার ঘটনাগুলো সেই দ্বৈত মানদণ্ডের বিতর্ককে আরও জোরালো করে তুলেছে। যখন উদ্ধারকর্মীরাও নিরাপদ নন, যখন মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিয়েও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়, তখন বোঝা যায় সংকট কতটা গভীর।

তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও একটি বিষয় চোখে পড়ে—মানুষের সহমর্মিতা। জরুরি সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীরা, চিকিৎসকরা, উদ্ধারকর্মীরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা জেনেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন। তারা হয়তো হিন্দকে বাঁচাতে পারেননি, কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে, তাকে সাহস দিয়ে, তার ভয় কমানোর চেষ্টা করে মানবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যুদ্ধ মানুষকে নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে, কিন্তু অন্যকে বাঁচানোর আকাঙ্ক্ষা এখনও হারিয়ে যায়নি।
হিন্দ রাজাবের মৃত্যু একটি শিশুর মৃত্যুর চেয়ে বড় কিছু। এটি একটি সতর্কবার্তা—যখন রাষ্ট্র, সামরিক শক্তি বা প্রশাসনিক কাঠামো মানবিক মূল্যবোধের ওপরে স্থান পায়, তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন শুধু যুদ্ধ থামানো নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুর জীবন আর অনুমতির অপেক্ষায় ঝুলে থাকবে না।
সভ্যতার মানদণ্ড শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির প্রতি আমাদের আচরণ দিয়ে। হিন্দ রাজাবের গল্প সেই মানদণ্ডের সামনে আমাদের সবাইকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সানজা ডি সিলভা জয়তিলেকা 


















