বাংলাদেশ থেকে অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়। উন্নত জীবনের আশায় এবং প্রবাসী স্বজনদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতি বছর হাজারো মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি কার্যকর হওয়ায় সেই পথ এখন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের শরীয়তপুরের শিবচরের বাসিন্দা মাহতাব মৃধা তাদেরই একজন। ইতালিতে পৌঁছানোর স্বপ্নে তিনি পরিবারসহ বিপুল অর্থ জোগাড় করেছিলেন। তিনটি গরু বিক্রি করে এবং ধারদেনা করে দালালদের হাতে তুলে দেন প্রায় ১৪ লাখ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতালিতে পৌঁছাতে পারেননি। পথে মাল্টায় আটক হওয়ার পর ১৮ মাসের মধ্যে দেশে ফিরতে হয় তাকে।
নতুন চুক্তি কী বলছে
১২ জুন থেকে কার্যকর হওয়া ইইউর মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্টের লক্ষ্য হলো অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য একটি অভিন্ন ইউরোপীয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সীমান্তে আগতদের দ্রুত যাচাই-বাছাই করা হবে এবং যাদের আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তাদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে।

সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এমন একটি বিধানও অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো অভিবাসীদের ইইউর বাইরের দেশে পাঠিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে। যদিও এই ব্যবস্থার বিস্তারিত এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনিক পারিয়াৎ বলেছেন, ২০১৫ সালের অভিবাসন সংকটের অভিজ্ঞতা থেকেই এই সংস্কার এসেছে। দীর্ঘ আট বছরের আলোচনার পর সদস্য দেশগুলো একটি যৌথ কাঠামোতে একমত হয়েছে।
বাংলাদেশিদের জন্য নতুন বাস্তবতা
২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮১০ বাংলাদেশি অনিয়মিতভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করেছেন। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশিরাও নিয়মিতভাবে ইউরোপগামী অভিবাসীদের শীর্ষ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন প্রথম ধাপে ২০ শতাংশের কম হারে অনুমোদিত হয়, তাদের জন্য দ্রুত সীমান্ত প্রক্রিয়া চালু হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আশ্রয় অনুমোদনের হার দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে অধিকাংশ বাংলাদেশি আবেদনকারীকে দ্রুত প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে, যেখানে আবেদন ও আপিলসহ পুরো সিদ্ধান্ত ১২ সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
কেন ঝুঁকি নিচ্ছেন বাংলাদেশিরা

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে পৌঁছাতে পারলে জীবন বদলে যাবে—এমন বিশ্বাস অনেক বাংলাদেশিকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শ্রম রপ্তানিকারক দেশ। প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দেশ ছাড়েন, যাদের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যান।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরীয় রুট বাংলাদেশিদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অস্থিতিশীলতা এই রুটকে আরও সক্রিয় করেছে। মানবপাচারকারীরাও এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নতুন গ্রাহক খুঁজছে।
কঠোরতা কি অভিবাসন থামাতে পারবে?
অভিবাসন গবেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, শুধু কঠোর আইন দিয়ে অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করা সম্ভব নয়। ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগরীয় রুটে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ অভিবাসী ও শরণার্থী জানিয়েছেন যে সীমাবদ্ধতামূলক নীতিমালা তাদের সিদ্ধান্তে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচার বন্ধ করতে হলে অভিবাসীদের উৎস দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পুনর্বাসন, বৈধ অভিবাসন পথ এবং পাচারবিরোধী সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।

ফেরার পর নতুন জীবন
ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন ভেঙে গেলেও মাহতাব মৃধা দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরু করেছেন। ইইউ-সমর্থিত পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় কৃষি প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি এখন একটি ছোট দোকান পরিচালনা করছেন এবং নিজের জমিতে পেঁয়াজ ও রসুন চাষ করছেন।
তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অন্যদের সতর্ক করে বলেন, বিদেশে অনিয়মিত পথে যাওয়ার পেছনে যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তার চেয়ে কম অর্থ দিয়েও দেশে সফল হওয়া সম্ভব। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা শেষ পর্যন্ত অনেকের জন্য স্বপ্নভঙ্গ আর ঋণের বোঝা ছাড়া কিছুই বয়ে আনে না।
ইইউর নতুন অভিবাসন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য ইউরোপের দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনিয়মিত পথ যে আরও কঠিন ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তা স্পষ্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















