বিশ্বসংগীতের অঙ্গনে কানাডার খ্যাতিমান বেহালাবাদক জেমস এহনেস দীর্ঘদিন ধরেই অনন্য এক নাম। প্রতিভাকে তিনি কখনও বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে মনে করেছেন দায়িত্ব। সেই দর্শন নিয়েই পাঁচ দশকের জীবনে তিনি গড়ে তুলেছেন এক সমৃদ্ধ সংগীতযাত্রা। এবার তিনি আবারও দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিরছেন, সঙ্গে থাকছে জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ড্রেসডেন ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রা।
আগামী ১৬ জুন গিয়ংগি প্রদেশের বুচন আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ কনসার্টে ম্যাক্স ব্রুখের বিখ্যাত ‘ভায়োলিন কনচের্তো নং–১’ পরিবেশন করবেন এহনেস। ১৫৬ বছরের ইতিহাস বহনকারী ড্রেসডেন ফিলহারমনিকের সঙ্গে এই আয়োজন ঘিরে সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
প্রতিভা থেকে পরিণত শিল্পী
জেমস এহনেস মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বেহালা শেখা শুরু করেন। ১৩ বছর বয়সেই তিনি একটি বড় অর্কেস্ট্রার সঙ্গে মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেন। ছোটবেলার বিস্ময়কর প্রতিভা তাঁকে দ্রুত আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিলেও তিনি নিজেকে এখনও শেখার পথে থাকা একজন শিল্পী হিসেবেই দেখেন।

তার মতে, একজন শিল্পীর কাজ শুধু নিখুঁতভাবে বাজানো নয়, বরং শ্রোতাদের কাছে একটি গল্প পৌঁছে দেওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি পরিবেশকের নিজস্ব কণ্ঠস্বর থাকা প্রয়োজন, আর সেই স্বর খুঁজে পাওয়ার যাত্রাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান।
সংগীতে ভারসাম্যের খোঁজ
বিশ্বের বড় বড় অর্কেস্ট্রার সঙ্গে নিয়মিত পরিবেশনার পাশাপাশি এহনেস চেম্বার মিউজিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। একটি স্ট্রিং কোয়ার্টেট পরিচালনা এবং চেম্বার সংগীতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতচিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
তিনি মনে করেন, একসঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়ে সংগীতের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে এটি মহান সুরকারদের সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই একক পরিবেশনা, কনচের্তো কিংবা চেম্বার মিউজিক—সব ক্ষেত্রেই তিনি সমান আনন্দ খুঁজে পান।
ড্রেসডেন ফিলহারমনিকের প্রতি মুগ্ধতা
আসন্ন কনসার্টে যাদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করবেন, সেই ড্রেসডেন ফিলহারমনিক সম্পর্কে এহনেসের প্রশংসা ছিল অকুণ্ঠ। তাঁর ভাষায়, এই অর্কেস্ট্রার সুর অত্যন্ত সমৃদ্ধ, উষ্ণ এবং মনোমুগ্ধকর।

প্রধান কন্ডাক্টর ডোনাল্ড রানিকলসের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। দীর্ঘদিনের বন্ধু ও প্রিয় সহকর্মী হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ করাকে সবসময়ই আনন্দের বলে মন্তব্য করেছেন এই বেহালাবাদক।
ব্রুখের অমর সৃষ্টি নিয়ে উচ্ছ্বাস
মঞ্চে যে সুরকর্মটি পরিবেশন করবেন, সেটি সম্পর্কে এহনেসের অনুভূতি গভীর। তাঁর মতে, ব্রুখের এই ভায়োলিন কনচের্তো এমন এক সৃষ্টি, যা যতবারই বাজানো হোক না কেন, কখনও একঘেয়ে লাগে না। এতে এমন এক আবেগঘন গল্প রয়েছে, যা সহজেই শ্রোতাদের হৃদয়ে পৌঁছে যায়।
এই কনসার্টে ব্রুখের কনচের্তোর পাশাপাশি আরও পরিবেশিত হবে রালফ ভন উইলিয়ামসের একটি ফ্যান্টাসিয়া এবং জোহানেস ব্রাহ্মসের চতুর্থ সিম্ফনি।
সফল পরিবেশনার সংজ্ঞা
বর্তমানে নিজের ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে পরিবেশনা করছেন এহনেস। তাঁর কাছে একটি সফল কনসার্টের অর্থ হলো—যে অনুভূতি ও বার্তা তিনি শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে চান, তা যদি সত্যিকারভাবে পৌঁছায়।
তিনি মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একজন শিল্পীর চিন্তা, অনুভূতি এবং বলার গল্প বদলে যায়। মানুষ যেমন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিণত হয়, তেমনি সংগীত সম্পর্কেও তার উপলব্ধি আরও গভীর হয়ে ওঠে। আর সেই পরিবর্তনই একজন শিল্পীর সৃজনশীল যাত্রাকে জীবন্ত রাখে।
জেমস এহনেসের এই কোরিয়া সফর তাই শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়, বরং এক শিল্পীর ক্রমবিকাশমান সংগীতদর্শনের নতুন প্রকাশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















