০৫:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
ব্রেক্সিটের দশ বছর পর: কেন ব্রিটেন এখনও স্থিতিশীল নেতৃত্বের খোঁজে তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর: বাংলাদেশে বিনিয়োগে আহ্বান, দ্রুত এফটিএর প্রতিশ্রুতি ব্রিটিশ রাজনীতিতে ভূমিকম্প: প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ছেন কিয়ার স্টারমার হাইলাইট: চলতি অর্থবছরের রাজস্বঘাটতি ৮৮ হাজার কোটি টাকা হতে পারে, জানাল এনবিআর হাইলাইট: ২০ বছর হাফ ভাড়ার সুবিধা নিয়ে কী প্রতিদান দেন শিক্ষার্থীরা, চালকের প্রশ্ন শুধু অর্থনীতি নয়, ভারত-জাপান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সভ্যতার বন্ধন গৃহকর্মীর জীবন কি এতটাই সস্তা? মালয়েশিয়ার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি, সন্ত্রাসবিরোধী গবেষণা ও বিনিয়োগে নতুন অগ্রগতি দুই দফা কমার পর আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরিতে যোগ হলো ৪,৪৩২ টাকা গাজীপুরে জলাবদ্ধতার মধ্যে খোলা ড্রেনে পড়ে প্রাণ গেল তরুণীর

গৃহকর্মীর জীবন কি এতটাই সস্তা?

দিল্লিতে এক গৃহকর্মীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড আবারও এমন এক বাস্তবতার দিকে আমাদের তাকাতে বাধ্য করেছে, যা সাধারণত সমাজের চোখ এড়িয়ে যায়। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শিশু বা বয়স্কদের দেখভাল—একটি পরিবারের প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে সচল রাখতে যেসব নারী শ্রম দেন, তাদের অধিকাংশই আইন, নীতি ও সামাজিক স্বীকৃতির দিক থেকে প্রায় অদৃশ্য।

ভারতের নগর জীবনের এক গভীর বৈপরীত্য এখানেই। একদিকে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর কর্মব্যস্ত জীবন গৃহকর্মীদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল; অন্যদিকে সেই শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নিরাপত্তা কিংবা মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে রাষ্ট্র ও সমাজ দীর্ঘদিন ধরে উদাসীন।

গৃহকর্মীরা প্রতিদিন এমন এক কর্মস্থলে প্রবেশ করেন, যা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পেশাগত। কারখানা, অফিস বা দোকানের মতো নয়, তাদের কর্মক্ষেত্র অন্যের বাড়ি। ফলে শোষণ, অপমান বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও তা প্রায়ই জনসমক্ষে আসে না। যে নির্যাতন সংবাদ শিরোনাম হয়, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি ঘটনা চার দেয়ালের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকে।

সমস্যার মূল শুধু অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিকতা। গৃহস্থালির কাজকে এখনো অনেকেই “স্বাভাবিক নারীর দায়িত্ব” হিসেবে দেখেন। ফলে যখন একই ধরনের কাজের জন্য কোনো নারী মজুরি পান, তখন সেই শ্রমকেও অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গিই গৃহকর্মীদের অধিকার প্রশ্নকে প্রান্তিক করে রেখেছে।

Nation builders? No, just unpaid women workers | Hindustan Times

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রেণি ও সামাজিক অবস্থানের বিষয়টি। গৃহকর্মীদের বড় অংশই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, সামাজিকভাবে বঞ্চিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে আসেন। যারা নীতিনির্ধারণ করেন এবং যারা এই শ্রমের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী—দুই পক্ষের মধ্যেই প্রায়শই একটি ক্ষমতার অসম সম্পর্ক কাজ করে। ফলে আইনি সুরক্ষা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বারবার পিছিয়ে যায়।

বহু বছর ধরেই গৃহকর্মীদের জন্য সমন্বিত আইন প্রণয়নের আলোচনা চলছে। কিন্তু কার্যকর ফলাফল এখনো দেখা যায়নি। ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ছুটি, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ—এসব বিষয় এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। বাস্তবে একজন গৃহকর্মীর চাকরি অনেক সময় সম্পূর্ণভাবে নিয়োগকর্তার সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

প্রযুক্তির যুগে পরিস্থিতির একটি নতুন মাত্রাও তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এখন গৃহকর্মী নিয়োগকে সহজ করেছে। কিন্তু নিয়োগের পদ্ধতি আধুনিক হলেও শ্রমের সুরক্ষা এখনো পুরোনো সমস্যার মধ্যেই আটকে আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকের পরিচয় বদলাতে পারে, কিন্তু আইনি সুরক্ষার অভাব দূর করতে পারে না।

Liberating domestic workers for equity and dignity | The Daily Star

এদিকে সম্প্রতি গৃহস্থালির অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে বিচার বিভাগীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে নারীদের শ্রমকে অর্থনৈতিক অবদানের বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু যদি আমরা সত্যিই গৃহস্থালির শ্রমের মূল্য স্বীকার করতে শুরু করি, তাহলে পরবর্তী প্রশ্নটি অনিবার্য: অন্যের ঘরে একই ধরনের শ্রম দেওয়া গৃহকর্মীদের কাজের মূল্য কত?

এই প্রশ্ন কেবল মজুরির নয়; এটি মর্যাদারও প্রশ্ন। একজন গৃহকর্মী শুধু ঘর পরিষ্কার করেন না, তিনি কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য সময় তৈরি করেন, শিশুদের দেখভাল করেন, অসুস্থ ও বয়স্কদের সেবা দেন এবং লাখো পরিবারের দৈনন্দিন জীবনকে সচল রাখেন। তাদের শ্রম ছাড়া আধুনিক নগর অর্থনীতির একটি বড় অংশ কার্যকর রাখা কঠিন।

সুতরাং গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা কোনো দয়া বা সহানুভূতির বিষয় নয়। এটি শ্রমের স্বীকৃতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্ন। যতদিন পর্যন্ত তাদের কাজকে আনুষ্ঠানিক শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া হবে, ততদিন সহিংসতা, শোষণ ও বৈষম্যের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

একটি সমাজের মানবিকতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল শ্রমজীবী মানুষদের কতটা মর্যাদা দেয়, তার ওপর। গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে সেই পরীক্ষায় আমরা এখনো উত্তীর্ণ হতে পারিনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রেক্সিটের দশ বছর পর: কেন ব্রিটেন এখনও স্থিতিশীল নেতৃত্বের খোঁজে

গৃহকর্মীর জীবন কি এতটাই সস্তা?

০২:২৫:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

দিল্লিতে এক গৃহকর্মীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড আবারও এমন এক বাস্তবতার দিকে আমাদের তাকাতে বাধ্য করেছে, যা সাধারণত সমাজের চোখ এড়িয়ে যায়। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শিশু বা বয়স্কদের দেখভাল—একটি পরিবারের প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে সচল রাখতে যেসব নারী শ্রম দেন, তাদের অধিকাংশই আইন, নীতি ও সামাজিক স্বীকৃতির দিক থেকে প্রায় অদৃশ্য।

ভারতের নগর জীবনের এক গভীর বৈপরীত্য এখানেই। একদিকে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর কর্মব্যস্ত জীবন গৃহকর্মীদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল; অন্যদিকে সেই শ্রমের ন্যায্য মূল্য, নিরাপত্তা কিংবা মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে রাষ্ট্র ও সমাজ দীর্ঘদিন ধরে উদাসীন।

গৃহকর্মীরা প্রতিদিন এমন এক কর্মস্থলে প্রবেশ করেন, যা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পেশাগত। কারখানা, অফিস বা দোকানের মতো নয়, তাদের কর্মক্ষেত্র অন্যের বাড়ি। ফলে শোষণ, অপমান বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও তা প্রায়ই জনসমক্ষে আসে না। যে নির্যাতন সংবাদ শিরোনাম হয়, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি ঘটনা চার দেয়ালের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকে।

সমস্যার মূল শুধু অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিকতা। গৃহস্থালির কাজকে এখনো অনেকেই “স্বাভাবিক নারীর দায়িত্ব” হিসেবে দেখেন। ফলে যখন একই ধরনের কাজের জন্য কোনো নারী মজুরি পান, তখন সেই শ্রমকেও অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গিই গৃহকর্মীদের অধিকার প্রশ্নকে প্রান্তিক করে রেখেছে।

Nation builders? No, just unpaid women workers | Hindustan Times

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রেণি ও সামাজিক অবস্থানের বিষয়টি। গৃহকর্মীদের বড় অংশই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, সামাজিকভাবে বঞ্চিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে আসেন। যারা নীতিনির্ধারণ করেন এবং যারা এই শ্রমের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী—দুই পক্ষের মধ্যেই প্রায়শই একটি ক্ষমতার অসম সম্পর্ক কাজ করে। ফলে আইনি সুরক্ষা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বারবার পিছিয়ে যায়।

বহু বছর ধরেই গৃহকর্মীদের জন্য সমন্বিত আইন প্রণয়নের আলোচনা চলছে। কিন্তু কার্যকর ফলাফল এখনো দেখা যায়নি। ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ছুটি, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ—এসব বিষয় এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। বাস্তবে একজন গৃহকর্মীর চাকরি অনেক সময় সম্পূর্ণভাবে নিয়োগকর্তার সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

প্রযুক্তির যুগে পরিস্থিতির একটি নতুন মাত্রাও তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এখন গৃহকর্মী নিয়োগকে সহজ করেছে। কিন্তু নিয়োগের পদ্ধতি আধুনিক হলেও শ্রমের সুরক্ষা এখনো পুরোনো সমস্যার মধ্যেই আটকে আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকের পরিচয় বদলাতে পারে, কিন্তু আইনি সুরক্ষার অভাব দূর করতে পারে না।

Liberating domestic workers for equity and dignity | The Daily Star

এদিকে সম্প্রতি গৃহস্থালির অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে বিচার বিভাগীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে নারীদের শ্রমকে অর্থনৈতিক অবদানের বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু যদি আমরা সত্যিই গৃহস্থালির শ্রমের মূল্য স্বীকার করতে শুরু করি, তাহলে পরবর্তী প্রশ্নটি অনিবার্য: অন্যের ঘরে একই ধরনের শ্রম দেওয়া গৃহকর্মীদের কাজের মূল্য কত?

এই প্রশ্ন কেবল মজুরির নয়; এটি মর্যাদারও প্রশ্ন। একজন গৃহকর্মী শুধু ঘর পরিষ্কার করেন না, তিনি কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য সময় তৈরি করেন, শিশুদের দেখভাল করেন, অসুস্থ ও বয়স্কদের সেবা দেন এবং লাখো পরিবারের দৈনন্দিন জীবনকে সচল রাখেন। তাদের শ্রম ছাড়া আধুনিক নগর অর্থনীতির একটি বড় অংশ কার্যকর রাখা কঠিন।

সুতরাং গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা কোনো দয়া বা সহানুভূতির বিষয় নয়। এটি শ্রমের স্বীকৃতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্ন। যতদিন পর্যন্ত তাদের কাজকে আনুষ্ঠানিক শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া হবে, ততদিন সহিংসতা, শোষণ ও বৈষম্যের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

একটি সমাজের মানবিকতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল শ্রমজীবী মানুষদের কতটা মর্যাদা দেয়, তার ওপর। গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে সেই পরীক্ষায় আমরা এখনো উত্তীর্ণ হতে পারিনি।