মাত্র দুই বছর আগে বিপুল ভোটে ক্ষমতায় এসে ব্রিটেনের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। কিন্তু সেই উত্থানের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পেরে এবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সোমবার লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে স্টারমার জানান, তিনি ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতৃত্ব ছাড়ছেন এবং নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
স্টারমারের এই সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা করেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা লেবার সরকার এখন নেতৃত্ব পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে।
নেতৃত্ব সংকটের পেছনের কারণ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, জনসেবার মানোন্নয়নে ধীরগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে অক্ষমতা সরকারের জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ উপনির্বাচনের পর। সেখানে সাবেক গ্রেটার ম্যানচেস্টার মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বিজয়ী হন এবং প্রকাশ্যে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রস্তুতি নেন। এর পর থেকেই স্টারমারের ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়তে থাকে।
নিজের বক্তব্যে স্টারমার বলেন, দল এখন প্রশ্ন তুলছে তিনি আগামী সাধারণ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না। সংসদীয় দলের মতামত তিনি গ্রহণ করেছেন এবং সেটি মর্যাদার সঙ্গে মেনে নিচ্ছেন।
![]()
সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে?
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন নেতৃত্বের দৌড়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম। সোমবারই তার পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেতৃত্ব পাবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এরই মধ্যে সাবেক স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিংও সম্ভাব্য নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গত মাসে স্টারমারের নেতৃত্বের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
জনপ্রিয়তা হারানোর পেছনের প্রেক্ষাপট
ক্ষমতায় আসার পর স্টারমার বেশ কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েন। বিশেষ করে জেফরি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিতর্কে জড়ানো পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিয়োগের সিদ্ধান্ত ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
একই সময়ে লেবার পার্টি উদারপন্থী ভোটারদের একটি অংশ হারাতে শুরু করে গ্রিন পার্টির কাছে। অন্যদিকে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকে ধারাবাহিকভাবে জনমত জরিপে শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা, দেশে সমালোচনা
দেশীয় রাজনীতিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্টারমারের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা এবং ইরান সংঘাত থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় কূটনৈতিক ভূমিকার জন্য তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন।
তবে এসব সাফল্য দেশের ভেতরে সরকারের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে যথেষ্ট হয়নি।
ট্রাম্পের মন্তব্য
স্টারমারের পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন যে স্টারমার অভিবাসন ও জ্বালানি নীতিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ট্রাম্প তার বার্তায় স্টারমারের জন্য শুভকামনাও জানান।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই নেতার সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রশ্নে ব্রিটেনের অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে।
স্টারমারের বিদায়ের মাধ্যমে ব্রিটেনে গত এক দশকে অকাল বিদায় ঘোষণা করা প্রধানমন্ত্রীর সংখ্যা দাঁড়াল ছয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার গণভোটের দশম বার্ষিকীর প্রাক্কালে এই রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে নতুন মোড়ে নিয়ে যেতে পারে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগে নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে লেবার পার্টি। নতুন নেতা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















