ব্রিটিশ রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসকে যদি একটি শব্দে সংক্ষেপ করা হয়, তবে সেটি হবে ‘অস্থিরতা’। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর এক দশক পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এসেছে, মহামারি মোকাবিলা করেছে, অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলেছে এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু এই দশকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্ভবত আরেকটি—নেতৃত্বের ক্রমাগত পরিবর্তন।
কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার মধ্য দিয়ে ব্রিটেন এখন দশ বছরে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার পথে। সংখ্যাটি শুধু রাজনৈতিক নাটকীয়তার প্রতীক নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটেরও ইঙ্গিত বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গণতন্ত্রগুলোর একটি এত ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনের চক্রে আটকে গেল?
ব্রেক্সিট ছিল এই অস্থিরতার সূচনা, কিন্তু পুরো ব্যাখ্যা নয়। গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে এমনভাবে বিভক্ত করেছিল, যার প্রভাব আজও শেষ হয়নি। ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগ ছিল সেই অধ্যায়ের প্রথম দৃশ্য। এরপর থেরেসা মে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে গিয়ে সংসদীয় অচলাবস্থার মধ্যে পড়েন। তার ব্যর্থতার পর ক্ষমতায় আসেন বরিস জনসন, যিনি ব্রেক্সিট সম্পন্ন করলেও পরবর্তীতে নানা কেলেঙ্কারি ও প্রশাসনিক সংকটের কারণে ক্ষমতা হারান।
এরপরের ঘটনাপ্রবাহ আরও দ্রুত। লিজ ট্রাসের সংক্ষিপ্ত কিন্তু অস্থির মেয়াদ ব্রিটেনের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধাক্কা দেয়। বাজারের প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য কত দ্রুত অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে। তার স্থলাভিষিক্ত ঋষি সুনাক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও জনসমর্থনের ক্ষয় রোধ করতে পারেননি।
২০২৪ সালে লেবার পার্টির বিপুল জয় অনেকের কাছে ছিল নতুন সূচনার প্রতিশ্রুতি। কিয়ার স্টারমার নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার বলেছিলেন যে তিনি বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটাবেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে প্রবৃদ্ধি দুর্বল, সরকারি ব্যয় চাপের মধ্যে এবং জনসেবাগুলো দীর্ঘদিনের অবহেলার ভার বহন করছে।

এই বাস্তবতা দ্রুত রাজনৈতিক সমস্যায় রূপ নেয়। কর বৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলের অসন্তোষ, সামাজিক কল্যাণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগে নিজ দলের বিদ্রোহ, মন্ত্রীদের পদত্যাগ এবং বিতর্কিত নিয়োগ সংক্রান্ত প্রশ্ন—সব মিলিয়ে স্টারমারের নেতৃত্ব ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। তার সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল হয়তো বিরোধী দলের আক্রমণ নয়, বরং নিজেদের মধ্যেই আস্থার ঘাটতি।
একই সময়ে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বে রিফর্ম ইউকের উত্থান ব্রিটিশ রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ব্রেক্সিট-পরবর্তী অসন্তোষ, অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ এবং মূলধারার দলগুলোর প্রতি হতাশা নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। একসময় প্রান্তিক বলে বিবেচিত যে রাজনৈতিক প্রবণতা, সেটিই এখন জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।
তবে নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতা কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি, যা এখনও ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে সংগ্রাম করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি ছিল অধিক স্বাধীনতা ও নতুন সম্ভাবনার। কিন্তু বাস্তবে দেশটিকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে কম উৎপাদনশীলতা, উচ্চ ঋণ, বাড়তে থাকা কল্যাণ ব্যয় এবং অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিবেশ।
ফলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে একটি পুনরাবৃত্ত চিত্র দেখা যাচ্ছে: নতুন নেতা আসেন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে, কিন্তু কাঠামোগত সমস্যার চাপে দ্রুত জনপ্রিয়তা হারান। এরপর আরেকজন নেতার আবির্ভাব ঘটে, যিনি আবার নতুন সূচনার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সমস্যাগুলো থেকে যায়।
দশ বছর আগে ব্রেক্সিট ভোট ছিল একটি রাজনৈতিক মোড়। দশ বছর পরে স্পষ্ট হচ্ছে, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ ছিল ভোটের ফল নয়, বরং সেই ফলাফলের পর দেশের জন্য একটি টেকসই পথ নির্মাণ করা। সাতজন প্রধানমন্ত্রী বদলানোর পরও ব্রিটেন এখনও সেই পথের সন্ধানেই রয়েছে।
রয়টার্স বিশেষ প্রতিবেদন অবলম্বনে 


















