চীনে প্রতারণার নতুন লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। দ্রুত প্রকাশনা, পেশাগত পদোন্নতি বা বৃত্তির শর্ত পূরণের চাপকে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান এমন একাডেমিক সম্মেলনের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, যেগুলোর অনেকের বাস্তব অস্তিত্বই নেই।
উহানের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক লিউ শিয়া ২০২৪ সালে এমন এক প্রতারণার শিকার হন। পেশাগত মূল্যায়নের জন্য একটি কনফারেন্স পেপার প্রকাশের প্রয়োজন ছিল তার। বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, গৃহীত প্রবন্ধ Elsevier পরিচালিত Compendex-সহ স্বীকৃত ডাটাবেসে সূচিভুক্ত হবে। তিনি ৪,৬০০ ইউয়ান প্রকাশনা ফি দেন। কিন্তু কয়েক মাস পর দেখতে পান, তার প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে একটি অচেনা জার্নালে, যা কোনো স্বীকৃত একাডেমিক ডাটাবেসে পাওয়া যায় না।
নেই সম্মেলন, নেই আয়োজক কমিটি
পরে লিউ জানতে পারেন, সম্মেলনটি আসলে কখনো অনুষ্ঠিতই হয়নি। এমনকি আয়োজক কমিটিও ছিল বানানো। তার ভাষায়, গবেষকেরা বোকা বলে প্রতারিত হন না; বরং সম্মেলন প্রকাশনার নিয়ম না জানলে সহজেই ফাঁদে পড়তে পারেন।
চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন আরও অনেকে। কেউ প্রবন্ধ জমা দিয়ে ৪,০০০ ইউয়ানের বেশি ফি দেওয়ার পর এক বছরেরও বেশি সময় কোনো খবর পাননি। সম্মেলন আদৌ হয়েছিল কি না, কিংবা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল কি না—সেটিও অস্পষ্ট থেকে গেছে।
বিদেশি শিক্ষকদের নামও ব্যবহার
গুয়াংডংভিত্তিক 5GH Foundation-এর প্রতিষ্ঠাতা উ গুয়াংহেং জানান, মে মাসে এক পাকিস্তানি শিক্ষার্থী জানান যে তার সুপারভাইজার ও সহকর্মীর নাম একটি সম্মেলনের আয়োজক কমিটিতে অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে। পাকিস্তানের ইউনিভার্সিটি অব সিন্ধের অধ্যাপক নাজমা মেমন পরে জানান, তিনি ওই সম্মেলনের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নন।
“ন্যানোম্যাটেরিয়ালস, বায়োমেডিসিন অ্যান্ড ক্যানসার থেরাপি” শীর্ষক ওই সম্মেলন ২০ জুন চীনের সুঝৌতে হওয়ার কথা ছিল। তবে তা অনুষ্ঠিত হয়নি। আয়োজকেরা পরে দাবি করে, সম্মেলন অনলাইনে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও জালিয়াতিতে
বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটিও এক বিবৃতিতে জানায়, একটি মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান সম্মেলনে তাদের নাম অনুমতি ছাড়াই আয়োজক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি জানায়, তারা ওই সম্মেলন আয়োজন, সহ-আয়োজন বা অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত নয়।
কেন টিকে আছে এই ব্যবসা
লিউ শিয়ার মতে, অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগই করেন না। আর যারা করেন, তাদের জন্যও পথ কঠিন। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে নিবন্ধিত এবং করদাতা। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো গভীর তদন্তে আগ্রহী বা সক্ষম হয় না।
এর পেছনে চীনের বৃহত্তর একাডেমিক চাপও কাজ করছে। কেউ কেউ জানেন এসব সম্মেলন নিম্নমানের, তবু পদোন্নতি, বৃত্তি বা মূল্যায়নের জন্য দ্রুত প্রকাশনার আশায় প্রবন্ধ জমা দেন। ফলে এক ধরনের পারস্পরিক সুবিধার বাজার তৈরি হয়েছে।
লিউর মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই আয়োজকেরা নিজেদের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ না করে বৈধ ও উচ্চমানের একাডেমিক সম্মেলনের ছদ্মবেশে অর্থ আয় করছে। এতে শুধু গবেষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, একাডেমিক প্রকাশনার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















