স্কটল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে জিম লেইটন একটি অনন্য নাম। দেশের হয়ে সর্বাধিক ৯১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এই সাবেক গোলরক্ষক শুধু চারটি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার বিরল কীর্তিই গড়েননি, জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ—প্রোস্টেট ক্যানসারের বিরুদ্ধেও জয় ছিনিয়ে এনেছেন। এখন তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করছেন অন্যদের সচেতন করতে।
প্রতি কয়েক সপ্তাহ পরপরই অ্যাবারডিনের পিটোড্রি স্টেডিয়ামে একদল পুরুষের সামনে দাঁড়ান লেইটন। তবে সেখানে ফুটবল নয়, আলোচনার বিষয় থাকে প্রোস্টেট ক্যানসার। তিনি মানুষকে নিয়মিত পরীক্ষা ও দ্রুত চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেন।
জীবন বদলে দেওয়া একটি পরামর্শ
২০১৮ সালে লেইটনের জীবন বদলে যায় এক বন্ধুর পরামর্শে। সাবেক সতীর্থ উইলি গার্নার নিজেও প্রোস্টেট ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি জানতে চান, লেইটন কখনও পরীক্ষা করিয়েছেন কি না। উত্তর ছিল ‘না’—যদিও তার বাবা ও চাচা দুজনই একই রোগে মারা গিয়েছিলেন।
পরীক্ষার ফল ছিল উদ্বেগজনক। ক্যানসার ইতোমধ্যে লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকেরা জানান, আরও দেরি হলে পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ হতে পারত। দীর্ঘ ৩৭ দিনের রেডিওথেরাপি এবং হরমোন চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। গত প্রায় চার বছর ধরে ক্যানসারমুক্ত রয়েছেন।
বিশ্বকাপের চার অধ্যায়
লেইটনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও ছিল নাটকীয়তায় ভরা। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন তরুণ রিজার্ভ গোলরক্ষক। পরে ১৯৮৬, ১৯৯০ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে খেলেন।
তার মতে, ১৯৮৬ সালের স্কটল্যান্ড দল ছিল দেশের অন্যতম সেরা দল। সেই আসরে ডেনমার্ক, পশ্চিম জার্মানি ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল তারা। উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের স্মৃতি এখনও তার কাছে বিশেষভাবে জীবন্ত।
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স ছিল অন্যতম সেরা। তবে ম্যাচের শেষ দিকে একটি ভুলের পর ব্রাজিল গোল করে এবং স্কটল্যান্ড বিদায়ের পথে এগিয়ে যায়। সেই হতাশা আজও তার স্মৃতিতে স্পষ্ট।
ফার্গুসনের সঙ্গে সম্পর্কের ভাঙন

লেইটনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল সাবেক কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করলেও ১৯৯০ সালের এফএ কাপ ফাইনালের রিপ্লেতে তাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বড় মোড় এনে দেয়।
এরপর সংবাদমাধ্যমের চাপ, সমর্থকদের সমালোচনা এবং পারিবারিক মানসিক কষ্ট তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সন্তানদেরও স্কুলে নানা বিদ্রূপের মুখে পড়তে হয়েছিল। পরে হাইবার্নিয়ানে যোগ দিয়ে তিনি আবার নিজেকে প্রমাণ করেন এবং জাতীয় দলে ফিরে আসেন।
দেশপ্রেম ও উত্তরাধিকার
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচ ছিল তার চতুর্থ ও শেষ বিশ্বকাপ যাত্রার সূচনা। রোনালদো, রিভালদো ও রবার্তো কার্লোসদের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখেন।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। তার ভাষায়, বিশ্বকাপে খেলাটা শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবার ও দেশের জন্যও।
সচেতনতার দূত
বর্তমানে লেইটনের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে প্রোস্টেট ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন করা। তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিয়ে পুরুষদের পরীক্ষা করানোর আহ্বান জানান।
তার বিশ্বাস, সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে সামনে এনে তিনি অন্যদের উৎসাহিত করছেন, যাতে কেউ অজ্ঞতার কারণে ঝুঁকিতে না পড়েন। একসময় গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে যেভাবে দলকে বাঁচাতেন, এখন সেভাবেই মানুষের জীবন রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছেন জিম লেইটন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















