ব্রিটিশ রাজনীতিতে ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের গল্প সাধারণত এক ধরনের পরিচিত নাটক অনুসরণ করে। সেখানে থাকে ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ কিংবা আদর্শগত সংঘাত। অনেক প্রধানমন্ত্রীই বিদায়ের সময় নিজেদের ব্যর্থতার দায় ভাগ করে নিতে পেরেছেন—দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী, বিদ্রোহী সংসদ সদস্য বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে। কিন্তু কিয়ার স্টারমারের পতনের কাহিনি ভিন্ন।
তার বিরুদ্ধে বড় কোনো বিদ্রোহ হয়নি। কেউ প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দখলের অভিযান চালায়নি। তিনি কোনো ঐতিহাসিক নীতিগত লড়াইয়ে পরাজিতও হননি। বরং তার নিজের দল ধীরে ধীরে তার ওপর আস্থা হারিয়েছে। নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন পরিণতি সম্ভবত এটিই—যখন বিরোধীরা নয়, নিজের সমর্থকেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আপনি আর সমাধানের অংশ নন।
এই অভিজ্ঞতা স্টারমারের উত্তরসূরির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হওয়া কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল নয়; এটি দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব। প্রতিটি সংকটে দলের চাপে নতি স্বীকার করে কিংবা অস্থায়ী জনপ্রিয়তা রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যখন একজন নেতা বারবার আপসের পথে হাঁটেন, তখন তার সহকর্মীরাও বুঝে যান যে চাপ সৃষ্টি করলেই সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব।
ফলে নেতৃত্বের কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।

নতুন প্রধানমন্ত্রী, পুরোনো সংকট
স্টারমারের বিদায়ের পর ব্রিটেন আবারও এক নতুন প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। গত এক দশকে এটি হবে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এমন দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তন স্বাভাবিক নয়। এটি শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয় না, বরং নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতার প্রশ্নও তোলে।
সবচেয়ে আলোচিত নাম এখন অ্যান্ডি বার্নহাম। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এবং দলীয় ভেতরে গ্রহণযোগ্যতাও তুলনামূলক বেশি। কিন্তু জাতীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তিনি এখনও অনেকটাই অজানা।
এই পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে: তাকে কি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে?
অনেকেই যুক্তি দেন, একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নেতার বৈধতা বাড়ায়। এতে তিনি নিজের কর্মসূচি ব্যাখ্যা করার সুযোগ পান এবং দলের সদস্যদের কাছ থেকে সরাসরি সমর্থন আদায় করতে পারেন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় সেই যুক্তিকে সমর্থন করে না।
দলীয় নির্বাচন কেন ফাঁদে পরিণত হতে পারে
ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নেতৃত্ব নির্বাচন প্রায়ই নতুন নেতাকে শক্তিশালী করার বদলে দুর্বল করে দেয়। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশে প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারের চেয়ে দলীয় কর্মী ও সংগঠকদের মন জয় করতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
ফলে নীতিগত অবস্থান ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যায়।

একটি নেতৃত্ব নির্বাচনে ট্রেড ইউনিয়ন, দলীয় কর্মী, বিভিন্ন চাপগোষ্ঠী ও মতাদর্শিক শিবির নিজেদের দাবিকে সামনে নিয়ে আসে। প্রার্থীকে সবার মন রক্ষা করতে হয়। শেষ পর্যন্ত যে নেতা বিজয়ী হন, তিনি প্রায়ই এমন সব প্রতিশ্রুতির ভার নিয়ে ক্ষমতায় আসেন যা পরে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসে এর উদাহরণ কম নয়। দলীয় সদস্যদের খুশি করতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনেক সময় পরে সরকার পরিচালনার বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। তখন শুরু হয় পিছু হটা, ব্যাখ্যা দেওয়া এবং রাজনৈতিক ক্ষয়।
এই কারণেই অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এখন মনে করেন, সংসদ সদস্যদের সিদ্ধান্তে যদি বার্নহাম নেতৃত্বে আসেন, তাহলে সেটি তার জন্য সুবিধাজনকও হতে পারে। তিনি অন্তত দলীয় নির্বাচনী প্রচারণার বাধ্যবাধকতা ছাড়া নতুনভাবে নিজের অবস্থান নির্ধারণের সুযোগ পাবেন।
বার্নহামের সামনে আসল পরীক্ষা
বার্নহামের সবচেয়ে বড় শক্তি আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হতে পারে—তিনি সম্পর্কে এখনও খুব কম কিছু নিশ্চিতভাবে জানা যায়।
তিনি আঞ্চলিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে। তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থায় সংস্কারের আগ্রহ দেখিয়েছেন। কিছু খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা বৃদ্ধির পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু অর্থনীতি, প্রবৃদ্ধি, কল্যাণনীতি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তার পূর্ণাঙ্গ দর্শন এখনও স্পষ্ট নয়।
আর সেখানেই নিহিত তার সুযোগ।

তিনি চাইলে স্টারমারের পথ অনুসরণ করতে পারেন—দলের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রেখে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে পারেন। এটি রাজনৈতিকভাবে সহজ পথ। কিন্তু সেই পথের শেষ কোথায়, সেটি স্টারমারের বিদায়ই দেখিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে তিনি চাইলে আরও কঠিন পথ বেছে নিতে পারেন। এমন একটি কেন্দ্র-বামপন্থী রাজনৈতিক দর্শন নির্মাণ করতে পারেন যা একদিকে প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকাও বজায় রাখবে। যেখানে কল্যাণ ব্যয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেখানে বেসরকারি উদ্যোগকে প্রতিপক্ষ নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখা হবে।
এই সিদ্ধান্ত কোনো নেতৃত্ব নির্বাচনের মঞ্চে নেওয়া সম্ভব নয়। এটি একজন নেতার নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে আসতে হয়।
অজানার মধ্যেই সুযোগ
ব্রিটেনের জনগণ এখনও নিশ্চিত নয় অ্যান্ডি বার্নহাম কেমন প্রধানমন্ত্রী হবেন। লেবার পার্টিও পুরোপুরি জানে না। কিন্তু অনিশ্চয়তার মধ্যেই তার সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে আছে।
তিনি যদি শুধুই আরেকজন আপসকামী প্রশাসক হয়ে ওঠেন, তাহলে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ব্যর্থ নেতৃত্বের তালিকায় তার নামও যোগ হবে। কিন্তু যদি তিনি নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার সাহস দেখাতে পারেন, তাহলে ব্রিটিশ রাজনীতির স্থবিরতা ভাঙার সুযোগ তার হাতেই রয়েছে।
নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা জনপ্রিয়তা নয়; বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের দলকেও অস্বস্তিতে ফেলতে পারার সাহস। বার্নহামের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে।
উইলিয়াম হেগ 


















