ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আবারও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এটি মহাদেশটির দ্বিতীয় বড় তাপপ্রবাহ, যা ইতোমধ্যে একাধিক দেশের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে এবং জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ফ্রান্সে মঙ্গলবার ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, আর আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন যে যুক্তরাজ্যও জুন মাসের তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারে।
ইউরোপের অন্তত ১৭টি দেশে উচ্চমাত্রার তাপ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, পোল্যান্ড ও সার্বিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ।

ফ্রান্সে চরম পরিস্থিতি
ফ্রান্সের আবহাওয়া বিভাগ মেতেও-ফ্রঁস জানিয়েছে, বুধবার ও বৃহস্পতিবারও দেশের বহু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকতে পারে। দেশের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা সর্বোচ্চ সতর্কতার আওতায় রয়েছে।
তীব্র গরমের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় ৬৮ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। জাতীয় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহারও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
রেকর্ডের দিকে যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিস জানিয়েছে, দেশটির কেন্দ্রীয় ও দক্ষিণাঞ্চলে তাপমাত্রা বুধবার ৩৮ ডিগ্রি এবং বৃহস্পতিবার ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে জুন মাসের বিদ্যমান ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশটির বড় অংশে বিরল ‘রেড এক্সট্রিম হিট ওয়ার্নিং’ জারি করা হয়েছে। জাতীয় রেল কর্তৃপক্ষও প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ অতিরিক্ত তাপের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক রেলপথে বিঘ্ন ঘটছে।
স্পেন, ইতালি ও জার্মানিতেও অস্বাভাবিক গরম
স্পেনে মঙ্গলবার অন্তত ১০টি এলাকায় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় বুধবার ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার থেকে আটলান্টিক মহাসাগরীয় শীতল বাতাস প্রবেশ করায় কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।
ইতালির অর্ধেকের বেশি শহরে সর্বোচ্চ স্তরের তাপ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ফ্লোরেন্স ও মিলানে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। অন্যদিকে জার্মান আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, সপ্তাহের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং শনিবার তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
মানুষের জীবনে প্রভাব
ফ্রান্সে গত এক সপ্তাহে অন্তত ৪০ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন। অধিকাংশই ছিলেন কিশোর-কিশোরী, যারা তীব্র গরমে অনিরাপদ জলাশয়ে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলেন। সরকারি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, তাপপ্রবাহের সময় নজরদারিবিহীন স্থানে সাঁতার কাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের বহু বাড়ি, স্কুল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমন এক সময় নির্মিত হয়েছিল, যখন আবহাওয়া তুলনামূলক শীতল ছিল। ফলে বর্তমান চরম তাপমাত্রার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ভবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই, আর যেসব দেশে রয়েছে, সেখানেও উচ্চ জ্বালানি ব্যয় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পূর্ব ইউরোপে নতুন শঙ্কা
আবহাওয়াবিদদের ধারণা, শুক্রবার থেকে পশ্চিম ইউরোপে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের দিকে ফিরতে শুরু করবে। তবে পূর্ব ইউরোপে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সপ্তাহান্তে সেখানে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির উচ্চ ঘরে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে ইউরোপ বিশ্বের অন্য যেকোনো মহাদেশের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। ফলে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, আরও তীব্র এবং বছরের আরও আগের সময়ে দেখা দিচ্ছে।
ইউরোপের বর্তমান তাপপ্রবাহ সেই বাস্তবতারই আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
#ইউরোপ #তাপপ্রবাহ #ফ্রান্স #যুক্তরাজ্য #স্পেন #জলবায়ুপরিবর্তন #চরমগরম #আবহাওয়া #ইতালি #বিশ্বসংবাদ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















