ভেনেজুয়েলায় বুধবার সন্ধ্যায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই ভূমিকম্পে বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ভবন ধসে পড়েছে এবং আতঙ্কিত মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। দেশটির সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করেছে।
দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে জানান, একাধিক অঙ্গরাজ্যে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সংখ্যা কিংবা হতাহতদের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তিনি জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিমানবন্দর ও শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব
ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার সিমোন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়ে। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কয়েক দিনের জন্য শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের হাসপাতালে যোগ দিয়ে আহতদের চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিছু স্কুলকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ সংগ্রহকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
ফ্যালকন অঙ্গরাজ্যে উদ্ধার অভিযান
উপকূলীয় ফ্যালকন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ভিক্টর ক্লার্ক জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর অন্তত ৩২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা আরও ১৫ জনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটি রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত উপকূলীয় শহর মোরনের পশ্চিমে ২২ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে। এর মাত্রা পরে ৭ দশমিক ২ হিসেবে সংশোধন করা হয়।
এর মাত্র এক মিনিট পর দ্বিতীয় ও আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পটি মোরনের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে ১০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে।

রাজধানীতে আতঙ্ক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি
সন্ধ্যা ৬টার কিছু পর সংঘটিত এই ভূমিকম্পগুলো ভেনেজুয়েলায় গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজধানী কারাকাসে বহু ভবন দুলতে শুরু করলে বাসিন্দারা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। কোথাও কোথাও ভবনের দেয়াল ধসে পড়ে এবং ধুলার মেঘ ছড়িয়ে পড়ে।
বহু এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়েছে, সড়কে ধ্বংসাবশেষ জমেছে এবং ভবনের ক্ষতির কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। রাজধানীর কিছু অংশে বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোন সেবাও বিঘ্নিত হয়েছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও সতর্কতা
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কারাকাসে মেট্রো ও প্রাকৃতিক গ্যাস সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। নাগরিকদের সরকারি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো জানান, রাজধানীর আলতামিরা এলাকা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে বাড়িঘর ও ভবন ধসের খবর পাওয়া গেছে। তিনি আফটারশকের ঝুঁকির কারণে বাসিন্দাদের খোলা জায়গায় অবস্থান করার পরামর্শ দেন।
আন্তর্জাতিক সহায়তার আশ্বাস
ভূমিকম্পের পর দ্রুত আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ও সহায়তার বার্তা আসতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ সহায়তা সমন্বয়ের কথা জানিয়েছেন। এছাড়া এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে এবং ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়াও সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ভূমিকম্পের কম্পন ব্রাজিল ও কলম্বিয়ার কিছু অংশেও অনুভূত হয়েছে। তবে সেখানে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র প্রথমে সুনামি সতর্কতা জারি করলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়।
ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে ভেনেজুয়ায় বিরল ঘটনা। যদিও দেশটি দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কয়েকটি ফল্ট লাইনের কাছে অবস্থিত, তবুও মেক্সিকো বা চিলির মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় সেখানে বড় ভূমিকম্প কম ঘটে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















