আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় পতন এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়াতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ভারতীয় রুপির অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। কয়েক মাস আগেও চাপের মুখে থাকা রুপি এখন জুন মাসে এশিয়ার সেরা পারফর্ম করা মুদ্রাগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার লেনদেনের এক পর্যায়ে রুপির মূল্য ০ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে প্রতি ডলারে ৯৪ দশমিক ১৬ রুপিতে পৌঁছায়। এটি মে মাসের শুরুর পর সর্বোচ্চ অবস্থান। গত মাসেই রুপি রেকর্ড দুর্বল হয়ে প্রতি ডলারে ৯৬ দশমিক ৯৬ রুপিতে নেমে গিয়েছিল। তবে এরপর থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশটির মুদ্রা।
তেলের দাম কমায় স্বস্তি
রুপির পুনরুদ্ধারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অপরিশোধিত তেলের মূল্যহ্রাস। এশীয় বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের পর সর্বনিম্ন। চলতি মাসে তেলের দাম ২০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা আরও বেশি তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করায় বাজারে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমেছে। ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর ভারতের জন্য এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং ডলারের চাহিদা কিছুটা কমেছে।
নীতিগত পদক্ষেপে ডলার প্রবাহ বৃদ্ধি
একই সময়ে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই) এবং কেন্দ্রীয় সরকার বিদেশি মুদ্রা প্রবাহ বাড়াতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়ে।
সরকারি বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগ আগস্ট ২০২৪-এর পর সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজার থেকেও বিদেশি অর্থপ্রবাহের বহির্গমন কমেছে। এসব কারণে রুপির ওপর অবমূল্যায়নের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জুন মাসে এখন পর্যন্ত রুপি প্রায় ০ দশমিক ৮ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। এশিয়ার প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে কেবল ফিলিপাইনের পেসো এর চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল যে মুদ্রাগুলোর ওপর, রুপি ও পেসো তাদের মধ্যে ছিল।
বাজারের প্রত্যাশা কী?
এএনজেড ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধীরাজ নিমের মতে, স্বল্পমেয়াদে ডলার-রুপি বিনিময় হার প্রায় ৯৫-এর কাছাকাছি স্থিতিশীল থাকতে পারে। তিনি মনে করেন, ৯৩ দশমিক ৫০ থেকে ৯৪-এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিম্নসীমা রয়েছে, যা বাজার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
তার মতে, রুপির ওপর অতিরিক্ত শক্তিশালী হওয়ার চাপ তৈরি হলেও আরবিআই বৈদেশিক মুদ্রা কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করার চেষ্টা করতে পারে, যা বিনিময় হারকে ভারসাম্যে রাখবে।
রিজার্ভ ও বৈশ্বিক নজর
ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৬৭১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে এপ্রিলের শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট ফরওয়ার্ড ডলার বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ভিত্তিক মূল্যস্ফীতি (পিসিই) তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই তথ্য থেকে ভবিষ্যতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার নীতির সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারেও প্রভাব ফেলবে।
তেলের দাম কমায় রুপির শক্তিশালী অবস্থান, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আরবিআইয়ের নীতিগত সহায়তায় জুনে ভারতীয় মুদ্রা এশিয়ার অন্যতম সেরা পারফর্মার হয়ে উঠেছে।




















