ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে প্রবৃদ্ধির নতুন কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৮০ বিলিয়ন ডলারের একটি উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক করিডোরের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় প্রস্তাবিত ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ (আইজিএনডি) উদ্যোগটি দেশের উত্তর-পশ্চিমের কৃষিভিত্তিক অঞ্চলকে ঢাকা হয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রপ্তানি প্রবেশদ্বারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
সরকার নীতিগতভাবে এই উদ্যোগ অনুমোদন করেছে এবং এটি আগামী পাঁচ বছরের সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
অবকাঠামোর বাইরে সমন্বিত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক
আইজিএনডি শুধু সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প নয়। এর আওতায় পরিবহন, লজিস্টিকস, বন্দর, জ্বালানি, শিল্পাঞ্চল, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এডিবির বাংলাদেশবিষয়ক অর্থনীতিবিদ চন্দন সাপকোটা বলেন, আগামী দুই দশকে এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো পণ্য পরিবহন ও ব্যবসায়িক ব্যয় কমানো, প্রতিষ্ঠান ও বাজারের মধ্যে সংযোগ বাড়ানো, সেবার মান উন্নত করা এবং আরও প্রতিযোগিতামূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। এর ফলে পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর হবে, শিল্প ও কৃষিভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী হবে এবং দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।

এডিবির অর্থায়ন ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা
এডিবি আগামী পাঁচ বছরে এই উদ্যোগে সর্বোচ্চ ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করবে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, আগামী দুই দশকে পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এর একটি বড় অংশ আসবে বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে।
নীতিনির্ধারকদের আশা, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা, শিল্প বৈচিত্র্য এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষমতা বাড়াতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আঞ্চলিক সংযোগে নতুন সম্ভাবনা
দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ উন্নয়নের পাশাপাশি আইজিএনডি উদ্যোগের লক্ষ্য হলো নেপাল, ভারত ও ভুটানের সঙ্গে সংযোগ আরও জোরদার করা। ভবিষ্যতে মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে থাইল্যান্ডের সঙ্গেও যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমানের মতে, কার্যকর আঞ্চলিক সংযোগ গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
সফলতার পথে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করবে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর। শুধু নিয়ন্ত্রণ শিথিল করলেই হবে না; প্রয়োজন ব্যাংকিং খাত সংস্কার, সুশাসন জোরদার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন।
বর্তমানে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বছরে গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে, যেখানে ভিয়েতনাম পেয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, দেশের দুর্বল যোগাযোগ ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু বিনিয়োগের জন্য ক্ষুধার্ত নয়, অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্যও ক্ষুধার্ত।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বন্ড বাজার, পুঁজিবাজার এবং অন্যান্য বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কাঠামো পুনর্গঠন করা প্রয়োজন, যাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি ও মুনাফার ভারসাম্য দেখতে পান।
সবশেষে এডিবির প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু কত কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হলো তা দিয়ে নয়, বরং বাংলাদেশ কতটা উৎপাদনশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারল, সেটি দিয়েই মূল্যায়িত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















