দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে দেখেছে মার্কিন রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর দলটির ভেতরে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি জোরালো হতে শুরু করেছে। এখন রিপাবলিকানদের একটি অংশ ইরানকে এমন একটি বাস্তববাদী রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে সহাবস্থান করতেই হবে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প নিজেই ইরানের নেতাদের “শক্তিশালী” এবং “বুদ্ধিমান” মানুষ বলে উল্লেখ করেন। তবে এই পরিবর্তন শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এই নতুন অবস্থানের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধী রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোও নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকান রাজনীতিতে এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং গভীর প্রজন্মগত পরিবর্তনও কাজ করছে। ইরানের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের ধারণা তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে আগের তুলনায় দুর্বল হচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ বছরের কম বয়সী সম্ভাব্য রিপাবলিকান সমর্থকদের ৫৩ শতাংশ ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ মনে করেন ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রতি অতিরিক্ত সমর্থন দেখিয়েছেন। বিপরীতে বয়স্ক রিপাবলিকানদের মধ্যে এই মনোভাব অনেক কম।
তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর পক্ষেও মত দিয়েছে। তাদের মতে, দেশটির উচিত বিদেশের সংঘাতের চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়া।
‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ থেকে সরে আসার আহ্বান
রক্ষণশীল সাময়িকী দ্য আমেরিকান কনজারভেটিভের নির্বাহী পরিচালক কার্ট মিলস বলেন, ইরান নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এখন আর তাদের দুর্বল করার প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ নেই। তার মতে, রিপাবলিকানদের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননও ইরানকে পরাজিত করা কতটা কঠিন, তা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ইতিহাসজুড়ে পারস্য বহু শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে টিকে থেকেছে এবং বর্তমান সংঘাতেও একই দৃঢ়তা দেখিয়েছে।
এমনকি কিছু রিপাবলিকান সিনেটরও আগের তুলনায় নরম ভাষা ব্যবহার করছেন। কানসাসের সিনেটর রজার মার্শাল সম্প্রতি বলেছেন, প্রতিটি দেশেরই আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে এবং ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তিনি “চিরস্থায়ী যুদ্ধ নয়” নীতির কথা উল্লেখ করে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে মত দেন।
দলীয় বিভাজন এখনো স্পষ্ট
তবে রিপাবলিকান পার্টির সবাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে একমত নন। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ এখনও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। তার মতে, তেহরানের শাসকদের প্রতি কোনো ধরনের আর্থিক বা রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ভুল হবে।
মন্টানার সিনেটর টিম শিহিও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব এখনও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব থেকে সরে আসেনি।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পারসি মনে করেন, যুদ্ধের পরও ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ভূমিকা রাখে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রাজনীতির একটি অংশ এখন আর ইরানকে আগের মতো কেন্দ্রীয় হুমকি হিসেবে দেখছে না।
পরিবর্তিত বাস্তবতা
ইরান যুদ্ধ এবং পরবর্তী শান্তি আলোচনাকে ঘিরে রিপাবলিকান রাজনীতিতে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বৈদেশিক নীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আপাতত স্পষ্ট হচ্ছে, ইরানকে ঘিরে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থান আর আগের মতো একক ও অটল নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















