সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত জীবন খোলামেলাভাবে তুলে ধরে ব্রিটেনের ২৮ বছর বয়সী কনটেন্ট নির্মাতা মিলি গোল্ডস্মিথ এক নতুন ধরনের জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রেমে ব্যর্থতা, শরীর নিয়ে অনিশ্চয়তা, মানসিক সংগ্রাম এবং আত্ম-অনুসন্ধানের গল্প শেয়ার করে তিনি ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে এক মিলিয়নের বেশি অনুসারী গড়ে তুলেছেন। এবার সেই অভিজ্ঞতাগুলোই জায়গা পেয়েছে তার প্রথম বই Things I Told My Notes App-এ।
ডিজিটাল প্রজন্মের কণ্ঠস্বর
প্রকাশকরা মিলি গোল্ডস্মিথকে “ডিজিটাল যুগের বাস্তব জীবনের ক্যারি ব্র্যাডশ” হিসেবে বর্ণনা করছেন। তার বইয়ে রয়েছে তরুণ নারীদের জীবনের পরিচিত নানা অভিজ্ঞতা—অসফল ডেট, সম্পর্কের অনিশ্চয়তা, শরীর নিয়ে উদ্বেগ, বন্ধুত্ব, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনা।
তবে মিলির প্রজন্মের অভিজ্ঞতায় যোগ হয়েছে আরও কিছু নতুন বাস্তবতা। তারা প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া, ঘুমের পরিসংখ্যান, অনলাইন স্বীকৃতি এবং ডিজিটাল উপস্থিতির চাপে বাস করে। মিলি নিজেও স্বীকার করেন, জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত কোনো না কোনোভাবে ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
‘৭০টি প্রথম ডেট, কিন্তু কোনো সম্পর্ক নয়’
নিজের প্রেমজীবন নিয়ে মিলি সবচেয়ে বেশি আলোচনা কুড়িয়েছেন। তার হিসাব অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৭০টি প্রথম ডেটে গিয়েছেন, কিন্তু এখনো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়াতে পারেননি।
তিনি জানান, তিনবার দেখা হওয়ার পর সম্পর্ক আরও গভীরে গেলে ভয় কাজ করে। এ কারণেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারেন না। ২০২৪ সালের বড়দিনে যখন তার ভাইবোনেরা নিজেদের সঙ্গীদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন, তখন বাবা-মায়ের সঙ্গে একা বাড়িতে থেকে তিনি তীব্র একাকীত্ব অনুভব করেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে প্রথমবার নিয়মিতভাবে নিজের অনুভূতি লিখে রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।
একাকীত্ব থেকে ভাইরাল হওয়া
নিজের নিঃসঙ্গতা, ব্যর্থ প্রেম এবং অপেক্ষার গল্প নিয়ে তৈরি করা একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া ফেলে। ভিডিওটি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
মিলির ভাষায়, তিনি ভাইরাল হওয়ার জন্য নয়, বরং মানুষের সঙ্গে সংযোগ খুঁজতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। তবে সেই পোস্টই তাকে বুঝতে সাহায্য করে যে তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনেক মানুষ নিজেদের মিল খুঁজে পান।
খাদ্যাভ্যাসের সংকট থেকে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া
কৈশোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা আদর্শ শরীরের চাপে পড়ে মিলি কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ শুরু করেছিলেন। ক্যালরি গুনে খাবার খাওয়া, ওজন কমানোর নেশা এবং শরীর নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে একজন কোচের সহায়তায় তিনি স্বাস্থ্যকর উপায়ে শরীরের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন। নিজের পরিবর্তনের ছবি ও অভিজ্ঞতা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার পর সেগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সেই সময়ই তিনি উপলব্ধি করেন যে তিনি কতটা অসুস্থভাবে নিজের শরীরকে দেখছিলেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার দ্বিমুখী বাস্তবতা
মিলি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একই সঙ্গে সুযোগ এবং ঝুঁকি তৈরি করে। একদিকে এটি তাকে কর্মজীবন, অনুসারী এবং একটি ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে এটি ক্রমাগত তুলনা, আত্মসন্দেহ এবং স্বীকৃতির নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
তার মতে, মানুষ এখন অন্যদের জীবন, সম্পর্ক ও সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে নিজের ছবি ও ভিডিও বারবার দেখার ফলে আত্ম-উপলব্ধিও বদলে যাচ্ছে।

‘লাইক’ থেকে পাওয়া ক্ষণস্থায়ী সুখ
বইয়ের একটি অংশে মিলি লিখেছেন, সামাজিক মাধ্যমে নির্দিষ্ট কারও ‘লাইক’ বা প্রতিক্রিয়ার ওপর নিজের আত্মবিশ্বাস নির্ভর করে যাচ্ছে—এ কথা স্বীকার করা তার জন্য সহজ নয়। তবু তিনি মনে করেন, ডিজিটাল যুগে অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটছে।
তার ভাষায়, একটি ‘লাইক’ মুহূর্তের জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার না পেলে হতাশাও তৈরি হতে পারে। এই মানসিক ওঠানামা ধীরে ধীরে এক ধরনের আসক্তিতে পরিণত হয়।
অনলাইন পরিচয়কে বাস্তব জগতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা
শুধু কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে নয়, লেখক ও উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন মিলি গোল্ডস্মিথ। তার বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও নিজের পরিচয় তৈরি করতে হবে।
নিজের অভিজ্ঞতা, দুর্বলতা এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামকে প্রকাশ্যে তুলে ধরেই তিনি একটি বৃহৎ দর্শকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন। আর সেই কারণেই অনেকের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন ডিজিটাল যুগের তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতার অন্যতম পরিচিত মুখ।
সংক্ষিপ্ত বিবরণ: প্রেম, একাকীত্ব, শরীর নিয়ে সংগ্রাম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব—এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে বই প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ ইনফ্লুয়েন্সার মিলি গোল্ডস্মিথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















