চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির মোকাবিলায় ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত অস্ত্রব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দিয়ে নয়াদিল্লি এখন এমন সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে, যা চীনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও সামরিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতের সামরিক ব্যয় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৯২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে দেশটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের হাতে আনুমানিক ১৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল এবং ২০২১-২০২৫ সময়ে দেশটি বিশ্বের পাঁচ বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারকের একটি ছিল।
চীনকে কেন্দ্র করে বদলাচ্ছে কৌশল
সিপ্রির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় দীর্ঘপাল্লার অস্ত্রব্যবস্থায় বিনিয়োগের প্রবণতা স্পষ্ট, যা মূলত চীনকে বিবেচনায় রেখেই গড়ে উঠছে। কয়েক দশক আগে ভারতের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ছিল প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। কিন্তু ধীরে ধীরে দেশটি ৩ হাজার কিলোমিটার বা তারও বেশি পাল্লার অস্ত্রব্যবস্থা যুক্ত করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার কে-৪ সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আগামী বছর মোতায়েন করা হতে পারে। এই সক্ষমতা ভারতের কৌশলগত প্রতিরোধ শক্তিকে আরও বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুই ফ্রন্টের যুদ্ধের ধারণা
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রভীন ডন্থি বলেন, ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর থেকেই বেইজিং ভারতের প্রধান কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘদিন ধরে ভারত সম্ভাব্য চীন-পাকিস্তান দ্বিমুখী যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসছে।
তবে চীন ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর হওয়ার ফলে সেই ধারণা নতুন রূপ নিয়েছে। ডন্থির মতে, পাকিস্তান এখন ক্রমেই চীনা সামরিক প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যা ভারতের সামরিক পরিকল্পনাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
ব্যয়ের আকার নয়, গুরুত্ব পাচ্ছে বিনিয়োগের ধরন
সিপ্রির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সামরিক ব্যয় ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ভারতের তুলনায় বেশি হারে বৃদ্ধি। তবে মোট ব্যয়ের হিসাবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাজেট এখনও ভারতের প্রায় এক-অষ্টমাংশ। অন্যদিকে ভারতের সামরিক ব্যয় চীনের ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক গাজালা ওয়াহাবের মতে, ভারতের সামরিক ব্যয় বাড়লেও তা খুব বেশি নয় এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় অর্ধেকই বেতন ও ভাতায় ব্যয় হয়। নতুন অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহের জন্য অবশিষ্ট অর্থ ব্যবহার করা হয়।

তার মতে, প্রকৃত পরিবর্তন ব্যয়ের পরিমাণে নয়, বরং ব্যয়ের অগ্রাধিকারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো ভারতও এখন স্বয়ংক্রিয় ও মানববিহীন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
ড্রোন ও দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে জোর
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ অর্থবছরে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মূল্য ছিল ৪৬৪ বিলিয়ন রুপি, যা ২০২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রতিরক্ষা রপ্তানিও রেকর্ড ৩৮৪ বিলিয়ন রুপিতে উন্নীত হয়েছে। ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা পণ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাত করার চেষ্টা করছে ভারত।
গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত থেকেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে নয়াদিল্লি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ যুদ্ধের বাস্তবতা বিবেচনায় দেশটি এখন দেশীয় ড্রোন প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
২০১৮ সালে চালু হওয়া ইনোভেশনস ফর ডিফেন্স এক্সেলেন্স (আইডেক্স) কর্মসূচি ভারতের ড্রোন খাতের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে স্টার্টআপ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানববিহীন প্রযুক্তি উন্নয়নে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখনও মূলত হালকা ও স্বল্পস্থায়ী কৌশলগত ড্রোন তৈরি করছে। দীর্ঘপাল্লার ও ভারী অস্ত্র বহনে সক্ষম উন্নত ড্রোন প্রযুক্তিতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ—সব মিলিয়ে ভারতের সামরিক আধুনিকীকরণ এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















