রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কাপড়ের বাজার বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন বহুতল মার্কেট নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। ১০৬ কাঠা জমির ওপর নির্মিতব্য ১০ তলা ‘বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণিবিতান’-এ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৯৬১ জন ব্যবসায়ী দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন। তবে দোকান বুঝে পাওয়ার আগেই কিস্তির টাকা জমার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
নতুন ভবনে থাকছে ৩ হাজারের বেশি দোকান
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন ভবনে একটি বেজমেন্ট, গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং আটটি তলা থাকবে। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৪২টি দোকান নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন হকার্স মার্কেটের জন্য পৃথকভাবে দোকান বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রতিটি দোকানের আয়তন হবে ৮০ থেকে ১০০ বর্গফুট।
নকশা অনুযায়ী, আগুনে ধ্বংস হওয়া পুরোনো কমপ্লেক্সের তুলনায় নতুন ভবনে ৮১টি বেশি দোকান থাকবে। বর্তমানে ভবনের তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ দৃশ্যমান।
অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতি কাটিয়ে পুনর্গঠন

২০২৩ সালের এপ্রিলে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বঙ্গবাজারের চারটি মার্কেটের প্রায় ৫ হাজার দোকান পুড়ে যায়। এতে হাজারো ব্যবসায়ী ও কর্মচারী জীবিকা হারান। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রায় ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করছে। এই অর্থ মূলত দোকানমালিকদের কাছ থেকেই কিস্তিতে আদায় করা হচ্ছে।
জানা গেছে, একটি দোকান বরাদ্দ পেতে ব্যবসায়ীদের গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে। পাঁচ কিস্তিতে এ অর্থ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং অনেক ব্যবসায়ী ধারদেনা করে কিস্তির টাকা পরিশোধ করছেন।
কিস্তির সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তৃতীয় কিস্তির অর্থ জমা দেওয়ার সময় প্রত্যেককে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা করে দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর আগে দ্বিতীয় কিস্তির সময়ও ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। মালিক সমিতির অফিসে পে-অর্ডারের স্লিপ জমা দেওয়ার পর আলাদা রসিদে এই অর্থ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সমিতির অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীদের জমা দেওয়া পে-অর্ডার গ্রহণের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকার রসিদ দেওয়া হচ্ছে। রসিদে উল্লেখ করা হয়েছে, এ অর্থ বেতন-ভাতা ও অফিস পরিচালনা ব্যয়ে ব্যবহার করা হবে। তবে অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, কেন এই অর্থ নেওয়া হচ্ছে এবং কীভাবে ব্যয় হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা ও প্রশ্ন

শুধু তৃতীয় কিস্তির ক্ষেত্রেই প্রায় ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ হতে পারে বলে হিসাব করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। এই অর্থের ব্যবহার, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিয়ে তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অনেক ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে ভবিষ্যতে দোকান বরাদ্দ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না। কেউ এটিকে দীর্ঘদিনের ‘সিস্টেম’ বলে মেনে নিচ্ছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে অর্থ দিচ্ছেন।
সিটি করপোরেশনের অবস্থান
অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার আলী খান বলেছেন, নির্ধারিত কিস্তির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কথা নয়। অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং কেউ জড়িত থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের গুলিস্তান ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল বাসেত জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং এর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজারের পুনর্গঠন ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন আশার বার্তা হলেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সেই আশার পথেই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















