যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর ইরান পারস্য উপসাগর থেকে দ্রুত তেল রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে দেশটি সম্ভাব্যভাবে প্রায় ৮৫০ কোটি ডলার আয় করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৩টার দিকে ‘ইমপালাস’ নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকার ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের পশ্চিম টার্মিনাল থেকে ধীরে ধীরে যাত্রা শুরু করে। জাহাজটির ধারণক্ষমতা ২০ লাখ ব্যারেল এবং এটি প্রায় পূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি সাও টোমে ও প্রিন্সিপের পতাকাবাহী। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এটি কাতারের উপকূলের কাছে অবস্থান করছিল এবং হরমুজ প্রণালীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এর স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় গন্তব্যসংক্রান্ত তথ্যে লেখা ছিল, “চীনা ক্রু জাহাজে রয়েছে।”
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-২ উপগ্রহের শনিবারের চিত্র বিশ্লেষণ করে নিক্কেই দেখতে পেয়েছে, খার্গ দ্বীপের পশ্চিম টার্মিনালে তিনটি বড় জাহাজ অবস্থান করছিল, যেগুলোকে তেলবাহী ট্যাংকার বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি যে ইমপালাস, তা নিশ্চিত করা গেছে।
উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, এর আগে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ওই টার্মিনালে কোনো জাহাজ ছিল না। তবে সম্প্রতি সেখানে কার্যক্রম দ্রুত বেড়েছে। বড় জাহাজকে নোঙর করতে সহায়তাকারী টাগবোটগুলোর একাধিক অবস্থান সংকেতও শনাক্ত হয়েছে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র জানায়, ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ইরান যুদ্ধ অবসানসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে তারা ইরানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের বিক্রি ও পরিবহনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেছে। ৬০ দিনের আলোচনার পর চূড়ান্ত সমঝোতা হলে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ওয়াশিংটন।
এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দরগুলো কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। ফলে খার্গ দ্বীপে বিপুল পরিমাণ তেল জমে যায়। অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের জন্য ইরান পুরোনো ট্যাংকার ব্যবহার করছিল। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পর এখন দ্রুত সেই তেল বাজারে পাঠানোর চেষ্টা করছে তেহরান।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার সামুদ্রিক ঝুঁকি ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ক্লেয়ার জাংম্যানের হিসাব অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত পারস্য উপসাগরের ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল সরবরাহের অপেক্ষায় ছিল। ইরানের তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন নৌবহরে বহন করা তেল যুক্ত করলে এ পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে।
মঙ্গলবার দুবাই ক্রুড তেলের স্পট মূল্য ছিল প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭০ ডলার। সেই হিসেবে সব তেল বিক্রি করা গেলে ইরানের আয় প্রায় ৮৫০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা স্থবির হয়ে গেলে বা ভেঙে পড়লে নিষেধাজ্ঞা আবার ফিরে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু তেহরান এ দাবি অস্বীকার করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার বলেন, “ইরান যদি চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করে বা তাদের আচরণ গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে যা করার প্রয়োজন আমি তাই করব।”
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৯ সালে প্রথম ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তীতে তা বিদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত, নৌপরিবহন এবং বীমা শিল্প পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির পর কিছু সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে সেই চুক্তি থেকে সরে আসে।
ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের শক্তিশালী চাহিদার কারণে গত বছর ইরান প্রতিদিন গড়ে ১৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। এটি ২০২০ সালের তুলনায় চার গুণ বেশি, যদিও ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি রপ্তানির রেকর্ডের নিচেই রয়েছে।
২০১৯ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছিলেন, ইরানের মোট আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে তেল বিক্রি থেকে।
( নিক্কেই এশিয়া, জার্কাতা পোস্ট ও নিউ ইয়র্কটাইমসের কিছু তথ্য নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে)
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















