ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন নতুন অর্থনৈতিক স্লোগানের অভাব নেই। কিছুদিন আগেও “সিকিউরোনমিকস” ছিল বহুল আলোচিত ধারণা। এর সমর্থকেরা বলতেন, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ধাক্কা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অবক্ষয়ের যুগে ব্রিটেনকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল অর্থনীতির পথে হাঁটতে হবে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই ধারণা প্রায় হারিয়েই যায়। এখন একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে আরেক নতুন শব্দকে ঘিরে— “ম্যানচেস্টারিজম”।
ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে ঘিরে যে রাজনৈতিক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে এই ধারণার উত্থানও জড়িত। সমর্থকেরা এটিকে আঞ্চলিক উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি নতুন পথ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। কিন্তু বাস্তবে ম্যানচেস্টারিজম কী? এটি কি সত্যিই উন্নয়নের কার্যকর মডেল, নাকি পুরোনো বামপন্থী রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতিকে নতুন মোড়কে উপস্থাপনের আরেক প্রচেষ্টা?
ম্যানচেস্টারের সাফল্যের প্রকৃত গল্প
ম্যানচেস্টারের সাম্প্রতিক পুনরুত্থান ব্রিটেনের অন্যতম আলোচিত নগর উন্নয়ন কাহিনি। কিন্তু এর ভিত্তি কোনো বিপ্লবী অর্থনৈতিক তত্ত্ব নয়। বরং এটি গড়ে উঠেছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় এবং বাস্তবধর্মী নীতিগত সংস্কারের ওপর।

২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘ম্যানচেস্টার ইন্ডিপেনডেন্ট ইকোনমিক রিভিউ’ অঞ্চলের দুর্বলতা ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে কয়েকটি স্পষ্ট সুপারিশ দেয়। শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, আবাসন উন্নয়ন, পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় এবং বিচ্ছিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা ছিল এর মূল বিষয়।
পরবর্তী সময়ে এসব সুপারিশ ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হয়। পরিকল্পনা অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সমন্বিত হয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে বিনিয়োগ বাড়ে এবং শহর প্রশাসন শক্তিশালী হয়। পরিবহন খাতে মেয়রের ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে বাস সেবা আরও সংগঠিত ও নির্ভরযোগ্য করা সম্ভব হয়।
এই সাফল্যের পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিল দক্ষ শাসনব্যবস্থা এবং সমন্বিত নীতিনির্ধারণ; কোনো ব্যাপক রাষ্ট্রীয় মালিকানা বা অর্থনীতির মৌলিক পুনর্গঠন নয়।
নতুন ব্যাখ্যার উত্থান
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ম্যানচেস্টারিজমকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। কিছু বামপন্থী চিন্তাবিদ দাবি করছেন, ম্যানচেস্টারের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে পানি, জ্বালানি, রেলপথ, সামাজিক আবাসন ও সামাজিক সেবার মতো খাতগুলোতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো উচিত।
তাদের যুক্তি হলো, বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেয়, অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সামাজিক প্রয়োজনকে সামনে রাখে। ফলে প্রয়োজনীয় সেবাগুলো জনস্বার্থের সঙ্গে আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
এই যুক্তি প্রথম দর্শনে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক বেশি জটিল। কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সফল হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো অদক্ষতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সমস্যার শিকার হয়েছে। শুধু মালিকানা পরিবর্তন করলেই দক্ষতা বা উন্নত সেবা নিশ্চিত হয় না।

রাষ্ট্র বনাম বাজার: বিতর্কের কেন্দ্রে উৎপাদনশীলতা
আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো— উৎপাদনশীলতা কীভাবে বাড়ানো যায়। এই জায়গাতেই নতুন রাষ্ট্রবাদী ব্যাখ্যার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতা প্রায়ই উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ব্যয় কমানো এবং সেবার মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই সব খাত একইভাবে কাজ করে না, এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি প্রয়োজন। কিন্তু সেখান থেকেও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই সব সমস্যার সমাধান।
বিশেষত পানি, জ্বালানি বা অবকাঠামোর মতো খাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এখনও অব্যাহত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট নেটওয়ার্ক এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এসব ক্ষেত্রকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ফলে এগুলোকে ‘প্রযুক্তিগত সীমায় পৌঁছে যাওয়া’ খাত হিসেবে বিবেচনা করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

ব্রিটেনের জন্য আসল শিক্ষা
ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা যে দুর্বল হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অবকাঠামো, গবেষণা, বিজ্ঞান ও শিল্পনীতিতে আরও সক্রিয় রাষ্ট্রের প্রয়োজন রয়েছে। কৌশলগত বিনিয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নমুখী সরকারি সমন্বয় আগামী দশকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কার্যকর রাষ্ট্র মানেই সর্বব্যাপী রাষ্ট্র নয়। দক্ষ সমন্বয়, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এক বিষয়; আর অর্থনীতির বিস্তৃত অংশকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা আরেক বিষয়।
ম্যানচেস্টারের অভিজ্ঞতা মূলত প্রশাসনিক দক্ষতা, স্থানীয় ক্ষমতায়ন এবং বাস্তবমুখী নীতিনির্ধারণের গল্প। এটিকে সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় মালিকানার পক্ষে রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হলে সেই অভিজ্ঞতার প্রকৃত শিক্ষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অতএব, ম্যানচেস্টারিজমের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এটি বাস্তববাদী উন্নয়ন কৌশল হিসেবে টিকে থাকে, নাকি আদর্শিক আকাঙ্ক্ষার ভারে নিজের মূল শক্তিকেই হারিয়ে ফেলে। ইতিহাস বলছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধারণত স্লোগান থেকে আসে না; আসে প্রতিষ্ঠান, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা থেকে।
জুলিয়েট স্যামুয়েল 



















