দক্ষিণ কোরিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দ্রুত উত্থান এখন শুধু শেয়ারবাজার বা করপোরেট মুনাফাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এই প্রবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশটির আবাসন বাজারেও। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাড়তি আয়, বিপুল বোনাস এবং শেয়ারমূল্যের উল্লম্ফন নতুন করে আবাসন কেনার চাহিদা তৈরি করেছে, যার ফলে সিউলসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অ্যাপার্টমেন্টের দাম দ্রুত বাড়ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার হোয়াসং শহরের ডংতান এলাকা, যা সিউল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত, বর্তমানে এই প্রবণতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের মতে, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের উৎপাদন কেন্দ্রের কাছাকাছি হওয়ায় বিপুল সংখ্যক তরুণ কর্মী আবাসন বাজারে প্রবেশ করছেন। এতে বাড়ির দাম এত দ্রুত বেড়েছে যে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাকেও নতুন করে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
চিপ শিল্পের পুনরুত্থান ও বোনাসের প্রভাব
রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান কেবি রিয়েল এস্টেটের তথ্য অনুযায়ী, ডংতানের লোটে ক্যাসেল আবাসন প্রকল্পে তিন শয়নকক্ষের একটি অ্যাপার্টমেন্টের গড় মূল্য এক বছরে ২৮ শতাংশ বেড়ে জুন মাসে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ওনে পৌঁছেছে। একই সময়ে চার শয়নকক্ষের ইউনিটের দাম বেড়েছে ২৭ দশমিক ১ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ওনে।

এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে স্যামসাংয়ের মেমোরি চিপ ব্যবসার পুনরুদ্ধার। এআই কম্পিউটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি চিপ সরবরাহকারী বিশ্বের অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি হলো স্যামসাং। বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা বৃদ্ধির ফলে কোম্পানিটির আয়ও বেড়েছে।
গত মাসে স্যামসাংয়ের শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে নতুন চুক্তি অনুযায়ী, মেমোরি চিপ ইউনিটের একজন গড় কর্মী আগামী বছরের শুরুতে প্রায় ৬০ কোটি ওন সমপরিমাণ বোনাস পেতে পারেন। একই সঙ্গে কোম্পানির শেয়ারের দামও প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, ফলে কর্মীরা শেয়ার বিক্রি বা জামানত হিসেবে ব্যবহার করে আবাসন কিনছেন।
অন্যদিকে এসকে হাইনিক্সও পরিচালন মুনাফার ১০ শতাংশ কর্মীদের বোনাস হিসেবে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। কোম্পানির সম্ভাব্য মুনাফা পূর্বাভাস অনুযায়ী, একজন গড় কর্মী প্রায় ৪০ কোটি ওন পর্যন্ত বোনাস পেতে পারেন।
সিউলেও বাড়ছে আবাসনের দাম
শুধু শিল্পাঞ্চল নয়, রাজধানী সিউলের আবাসন বাজারেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে সিউলে বাড়ি কেনার জন্য শেয়ার ও বন্ড বিক্রির হার বেড়ে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

বিশেষ করে অভিজাত গ্যাংনাম অঞ্চলসহ সিউলের ১১টি প্রধান জেলায় অ্যাপার্টমেন্টের গড় মূল্য গত বছরের ১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ওন থেকে বেড়ে চলতি বছরের মে মাসে ১ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ওনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আবাসন লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ছয় মাস আগের তুলনায় মে মাসে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
শেয়ারবাজারেও অব্যাহত বিনিয়োগ
যদিও অনেক বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে আবাসন কিনছেন, তবু দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে অর্থপ্রবাহ কমেনি। কোরিয়া এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান জিয়ং ইউন-বোর ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারে নতুন অর্থপ্রবাহ এখনও অর্থ উত্তোলনের তুলনায় বেশি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিছু শেয়ার বিক্রি করলেও দেশীয় বিনিয়োগকারীরা সেই ঘাটতি পূরণ করছেন।
কোরিয়া ফাইন্যান্সিয়াল ইনভেস্টমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, ১৯ জুন পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের আমানত ১২৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ওনে পৌঁছেছে, যা তিন মাস আগের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি।
কেন এখনও জনপ্রিয় রিয়েল এস্টেট?
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের রিটার্ন বেশি হতে পারে, তবে ঝুঁকি সমন্বয় করে দেখলে আবাসন বিনিয়োগ অনেকের কাছে আরও আকর্ষণীয়। কারণ বাড়ি শুধু বিনিয়োগ নয়, একই সঙ্গে এটি বসবাসেরও সুযোগ দেয়।
কোরিয়া ক্যাপিটাল মার্কেট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক পার্ক চ্যাং-গিউনের মতে, আবাসন সম্পদকে শুধু বিনিয়োগ হিসেবে নয়, জীবনযাত্রার একটি অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। এই বাস্তবতাই দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবারগুলোর মধ্যে রিয়েল এস্টেটের প্রতি দীর্ঘদিনের আগ্রহকে ব্যাখ্যা করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার এআই-নির্ভর চিপ শিল্পের বিস্তার এখন অর্থনীতির অন্য খাতগুলোতেও প্রভাব ফেলছে। প্রযুক্তি খাতের সাফল্য কীভাবে আবাসন বাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে দেশটির সেমিকন্ডাক্টর করিডর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















