পৃথিবী থেকে প্রায় ১,১০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান দুটি বিশাল গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। আকারে তারা বৃহস্পতির সমান বা তার চেয়েও বড় হলেও ঘনত্ব এতটাই কম যে বিজ্ঞানীরা তাদের তুলনা করছেন ক্যান্ডিফ্লস বা তুলার মিছরির সঙ্গে। নতুন আবিষ্কৃত এই দুই গ্রহকে “সুপারপাফ” শ্রেণির গ্রহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিরল ধরনের গ্রহগুলোর মধ্যে অন্যতম।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, একই নক্ষত্রমণ্ডলে একসঙ্গে দুটি সুপারপাফ গ্রহ পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
বিরল ও অদ্ভুত গ্রহের জগৎ
আমাদের সৌরজগতের বাইরে এখন পর্যন্ত মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে ৬ হাজারেরও বেশি বহির্গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে লাভায় ভরা গ্রহ, গভীর সমুদ্রে আচ্ছাদিত জলময় পৃথিবী, তরল কাচের বৃষ্টিপাত হওয়া উত্তপ্ত গ্যাসীয় গ্রহ এবং পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড় পাথুরে গ্রহ।

তবে এসবের মধ্যেও সুপারপাফ গ্রহগুলোকে সবচেয়ে রহস্যময় বলে মনে করা হয়। পৃথিবীর গড় ঘনত্ব যেখানে প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ৫.৫ গ্রাম, সেখানে তুলার মিছরির ঘনত্ব মাত্র ০.০৫ গ্রাম। নতুন আবিষ্কৃত দুই গ্রহের ঘনত্ব যথাক্রমে ০.০৩৮ ও ০.০৪৭ গ্রাম প্রতি ঘন সেন্টিমিটার, যা ক্যান্ডিফ্লসের চেয়েও কম।
বিশাল আকার, অবিশ্বাস্য হালকাপনা
গ্রহ দুটির নাম দেওয়া হয়েছে TOI-791b এবং TOI-791c। তারা দক্ষিণ আকাশের ভোলানস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত একটি সূর্যসদৃশ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
TOI-791b আয়তনে পৃথিবীর প্রায় ১,৪০০ গুণ বড় হলেও ভর মাত্র ৯.৫ গুণ বেশি। অন্যদিকে TOI-791c আয়তনে পৃথিবীর ২,১০০ গুণেরও বেশি হলেও ভর মাত্র ১৮.৬ গুণ বেশি। এর ফলে গ্রহ দুটির গড় ঘনত্ব অত্যন্ত কম হয়েছে।
কীভাবে ধরা পড়ল এই গ্রহ?
গ্রহ দুটি প্রথম শনাক্ত করে নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইট (টেস)। এই পদ্ধতিতে কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার সময় নক্ষত্রের উজ্জ্বলতায় সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়, যা বিশ্লেষণ করে গ্রহের অস্তিত্ব নির্ণয় করা হয়।
পরে গ্রহ দুটির কক্ষপথের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় প্রভাব বিশ্লেষণ করে তাদের ঘনত্ব ও ভর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। গবেষকদের এই আবিষ্কার নিশ্চিত করতে অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত ASTEP টেলিস্কোপ দিয়ে টানা আট বছরের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হয়েছে।

কেন এত হালকা?
গবেষকদের ধারণা, গ্রহগুলো তুলনামূলকভাবে তরুণ হলে তাদের গঠনের সময় সঞ্চিত তাপ গ্যাসকে প্রসারিত করে বিশাল আকৃতি দিতে পারে। তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যে নক্ষত্রকে তারা কেন্দ্র করে ঘুরছে সেটি খুব বেশি নবীন নয়। ফলে গ্রহগুলোর এই অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের পেছনে অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে।
একটি প্রচলিত তত্ত্ব বলছে, এসব গ্রহের চারপাশে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামে সমৃদ্ধ অত্যন্ত পুরু বায়ুমণ্ডল রয়েছে, যা তাদের মোট ভরের বড় অংশ গঠন করে। সম্ভবত নক্ষত্র থেকে অনেক দূরের শীতল অঞ্চলে গ্যাস দ্রুত জমা হয়ে এই বিশাল গ্যাসীয় আবরণ তৈরি হয়েছিল।
নতুন অনুসন্ধানের লক্ষ্য
গবেষক দলের সদস্যরা মনে করছেন, এই নক্ষত্রমণ্ডল সুপারপাফ গ্রহের উৎপত্তি ও বিবর্তন বোঝার জন্য একটি অনন্য গবেষণাগার হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে গ্রহ দুটির বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে জানা যেতে পারে, কীভাবে এত বড় অথচ এত কম ঘনত্বের গ্রহ তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















