দীর্ঘদিন ধরে বাধ্যতামূলক হিজাব ইরানের সমাজ ও রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সরকারপন্থী সমাবেশ ও প্রচারমূলক কর্মকাণ্ডে এখন অনাবৃত বা আংশিক অনাবৃত নারীদেরও তুলে ধরা হচ্ছে, যা ইরানের রাজনৈতিক বার্তায় একটি নতুন মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার পর ইরানের শাসকগোষ্ঠী জাতীয় ঐক্যের একটি নতুন ধারণা সামনে আনার চেষ্টা করছে। এই বার্তায় সরকার সমর্থক ও সমালোচক উভয়কেই একই জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। লক্ষ্য হলো বিদেশি চাপ ও সামরিক হুমকির বিরুদ্ধে জনগণকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করানো।
ঐক্যের নতুন ভাষা
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাষ্ট্রসমর্থিত প্রচারণায় এমন অনেক ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে নিজেদের সাবেক সরকারবিরোধী বলে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের দেখা গেছে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানাতে। এসব ভিডিওতে কেউ কেউ বলছেন, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে এবং দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শিখিয়েছে।
এ ধরনের বার্তার মাধ্যমে সরকার বোঝাতে চাইছে যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাই এক হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি হামলা বা চাপের মুখে জাতীয় সংহতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অনাবৃত নারীদের উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইরানে হিজাব এখনো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। নিয়ম ভঙ্গ করলে নারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব ছাড়া চলাফেরা করছেন এবং বড় শহর থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঞ্চলে এমন দৃশ্য ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠেছে।
তবে রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় অনাবৃত নারীদের উপস্থিতি আগে প্রায় দেখা যেত না। এখন সরকারপন্থী সমাবেশ ও অনুষ্ঠানের প্রচারচিত্রে তাদের স্থান দেওয়া হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন একটি বার্তা যে রাষ্ট্র তার সমর্থনের পরিধি বাড়াতে চাইছে এবং অতীতের বিভাজন কমিয়ে বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়কে সামনে আনতে আগ্রহী।
যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। সরকার মনে করছে, বাহ্যিক চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বিষয়টি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভক্তিকে কিছুটা হলেও পেছনে ঠেলে দিয়েছে। ফলে নতুন প্রচারণায় ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও নারীদের অংশগ্রহণের নতুন ধরনের উপস্থাপনা দেখা যাচ্ছে। সরকারপন্থীরা এটিকে জাতীয় পুনর্মিলনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের দাবি, অতীতে যাঁরা রাষ্ট্রের সমালোচক ছিলেন, তাঁরাও এখন দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এক অবস্থানে দাঁড়াচ্ছেন।
তবে সংশয় রয়ে গেছে
সবাই অবশ্য এই পরিবর্তনকে আন্তরিক বলে মনে করছেন না। অনেক সমালোচকের মতে, এটি মূলত রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে তৈরি করা একটি নতুন প্রচারণা। তাঁদের অভিযোগ, যেসব বিষয়ে আগে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল, এখন সেগুলোকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে জনসমর্থন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে।
তবে সমর্থক ও সমালোচকদের বিতর্কের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানে জাতীয়তাবাদের নতুন ভাষা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এই ভাষায় ধর্মীয় অনুগত, সংস্কারপন্থী, এমনকি একসময় রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে পরিচিত মানুষদেরও একই জাতীয় পরিচয়ের ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সামাজিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই নতুন বার্তা কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে দেশটির রাজনৈতিক প্রচারণায় এটি যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত, তা নিয়ে খুব কমই দ্বিমত রয়েছে।
ইরানে নতুন জাতীয়তাবাদের বার্তা তুলে ধরতে সরকারপন্থী প্রচারণায় অনাবৃত নারীদেরও সামনে আনা হচ্ছে। জাতীয় ঐক্য গঠনের নতুন কৌশল নিয়ে আলোচনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















