কোনো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গেলে সাধারণত আমরা ভূগোল, সংস্কৃতি, ধর্ম, প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা নেতৃত্বের গুণাবলির দিকে তাকাই। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দেখায়, এগুলোর কোনোটিই এককভাবে কোনো দেশের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করে না। বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনগণের জন্য উন্মুক্ত তার ওপর।
যখন একটি ক্ষুদ্র ক্ষমতাবান গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত করে, তখন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সংকুচিত হয়ে পড়ে। জনগণের বৃহৎ অংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এই রাজনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক বঞ্চনা। তখন সম্পদ, সুযোগ এবং নীতিগত সুবিধা সীমিত কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। জাতীয় সম্পদ থেকে উৎপন্ন লাভ সমাজজুড়ে ছড়িয়ে না পড়ে একটি অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে জমা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এমন ব্যবস্থা শুধু বৈষম্যই বাড়ায় না, রাষ্ট্রের বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে।
এই ধারণাটিই আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ড্যারন অ্যাসেমোগলু ও জেমস রবিনসনের গবেষণার মাধ্যমে। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি বা দারিদ্র্যের মূল ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃতি বুঝতে হবে। যেসব দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টিত এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত, সেসব দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নতি করে। বিপরীতে, যেসব দেশে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি ছোট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেসব দেশ উন্নয়নের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে।
উন্নয়নবিষয়ক আলোচনায় প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঠে আসে: একই ধরনের ইতিহাস, সংস্কৃতি বা ভৌগোলিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও কেন কিছু দেশ এগিয়ে যায়, আর কিছু দেশ পিছিয়ে থাকে? এর উত্তর পাওয়া যায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদাহরণে।
কোরীয় উপদ্বীপ তার অন্যতম স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। একসময় উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল একই রাষ্ট্রের অংশ। ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস ছিল অভিন্ন। কিন্তু রাজনৈতিক পথ ভিন্ন হওয়ার ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়া গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরি করেছে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীভূত একদলীয় শাসনের অধীনে রয়েছে। ফলাফল আজ দৃশ্যমান।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার নোগালেস এবং মেক্সিকোর সোনোরার নোগালেস শহর দুটি ভৌগোলিকভাবে প্রায় একই পরিবেশে অবস্থিত। মাঝখানে কেবল একটি সীমান্ত। তবুও নাগরিকদের আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। কারণ দুই পাশে গড়ে উঠেছে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার সময় যে দেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে পিছিয়ে ছিল, কয়েক দশক পর সেই দেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারে—যদি সে মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, নারীর অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেয়। আবার প্রাথমিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কোনো দেশ পিছিয়ে পড়তে পারে, যদি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর, অস্বচ্ছ এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
তবে প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল আইন পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো বদলানো হলেও প্রকৃত ক্ষমতার উৎস অপরিবর্তিত থেকে যায়। তখন সংস্কারের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। নতুন নেতৃত্ব এলেও যদি প্রণোদনা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য না বদলায়, তাহলে পুরোনো সমস্যাগুলো নতুন রূপে ফিরে আসে।
সেই কারণেই উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে আইনের শাসন, নিরপেক্ষ প্রশাসন, সম্পত্তির অধিকার, ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা এবং উন্মুক্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে বিনিয়োগ বাড়ে, উদ্ভাবন উৎসাহিত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তৃত হয়। মানুষ তখন কেবল টিকে থাকার জন্য নয়, নতুন কিছু সৃষ্টির জন্যও কাজ করতে আগ্রহী হয়।
ইতিহাসের সফল রাষ্ট্রগুলো সাধারণত এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পেরেছে, যেখানে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলেই অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। উদ্ভাবন, শিল্পায়ন এবং উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি সেই প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক ফল।
অন্যদিকে, যেসব রাষ্ট্রে ক্ষমতা সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, সেখানে স্বল্পমেয়াদে কিছু মানুষের বিপুল সম্পদ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি সাধারণত টেকসই হয় না। কারণ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত থাকলে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে।
রাষ্ট্রের সাফল্য তাই কেবল প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সেই প্রবৃদ্ধির সুযোগ কতটা বিস্তৃত, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতজনের অংশগ্রহণ রয়েছে, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার স্বার্থে কাজ করছে। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—যে দেশ জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করে, সে দেশ এগোয়; আর যে দেশ জনগণকে বাদ দেয়, সে দেশ শেষ পর্যন্ত নিজের সম্ভাবনাকেই সীমাবদ্ধ করে ফেলে।
জাফর মির্জা 


















