যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক খুনের হার কমলেও পুলিশি গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। গত এক দশকে দেশজুড়ে পুলিশের হাতে নিহত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
সম্প্রতি নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্ক শহরের একটি ঘটনাকে ঘিরে এই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। আত্মহত্যার হুমকি দেওয়া এক তরুণকে সাহায্য করতে পরিবার জরুরি সেবা চাইলেও ঘটনাস্থলে পৌঁছান একদল পুলিশ সদস্য। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে ওই তরুণ নিহত হন। চলতি বছরে শহরটিতে এটি পুলিশের হাতে চতুর্থ মৃত্যুর ঘটনা।
আলবুকার্কে দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে। অতীতে একাধিক ঘটনার পর পুলিশ বিভাগের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা হয় এবং বলপ্রয়োগ কমাতে বিশেষ সংস্কার কর্মসূচি চালু করা হয়। কয়েক বছর ধরে ফেডারেল পর্যবেক্ষণের আওতায় থেকে বিভাগটি নতুন নীতিমালা গ্রহণ করে, সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থাও চালু করে।
সংস্কারের পরও কেন বাড়ছে মৃত্যু
সংস্কার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল পুলিশি গুলির ঘটনা কমবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মৃত্যুর সংখ্যা প্রত্যাশিতভাবে কমেনি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালা পরিবর্তন হলেও মাঠপর্যায়ে আচরণগত পরিবর্তন সব সময় সমানভাবে কার্যকর হয় না।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের মধ্যে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। অতীতে অনেক কর্মকর্তা সরাসরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি প্রাণঘাতী পরিণতির দিকে চলে যেতে পারে।

শহরভেদে ভিন্ন চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের সব এলাকায় পরিস্থিতি এক নয়। কিছু শহরে পুলিশি হত্যাকাণ্ড কমেছে, আবার অনেক শহরে বেড়েছে। এই পার্থক্য দেখায় যে কার্যকর নীতি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
কিছু বড় শহরে ধাওয়া বা তাড়া করার নিয়ম সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পর পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর সংখ্যা কমতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংঘাত কমানোর কৌশল এবং পরিস্থিতি শান্ত করার প্রশিক্ষণ আরও বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করা দরকার।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সংকটও বড় কারণ
অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যেখানে মূল সমস্যা অপরাধ নয় বরং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তার অভাবে সংকটাপন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা কখনও কখনও প্রাণঘাতী পরিণতিতে গড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী না হলে শুধু পুলিশি সংস্কার দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সামাজিক সুরক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা এবং সংকট মোকাবিলার বিকল্প ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন উদ্বেগের কারণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রামীণ এলাকায় কর্মরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুলির ঘটনাও দ্রুত বেড়েছে। কয়েকটি আলোচিত ঘটনার পর আবারও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও অতীতের মতো বড় আকারের জনবিক্ষোভ এখনও দেখা যায়নি, তবু পর্যবেক্ষকদের মতে, যেকোনো নতুন মর্মান্তিক ঘটনা জনমতকে আবারও উত্তাল করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ কমার ইতিবাচক প্রবণতার পাশাপাশি পুলিশি গুলিতে মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বগতি এখন দেশটির বিচারব্যবস্থা, জননিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে খুনের হার কমলেও পুলিশি গুলিতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। সংস্কার ও প্রশিক্ষণের পরও কেন থামছে না এই প্রবণতা, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















