শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবমাননাকর মন্তব্য করে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাংস্কৃতিক-বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান। তার ফেসবুক পোস্ট ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পদ স্থগিতের দাবিও উঠেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত
শনিবার (২৭ জুন) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেন জায়িদ হাসান। সেখানে তিনি জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকীকে উল্লেখ করে ‘জাহান্নামের ইমামের মরণ দিবস’ বলে মন্তব্য করেন। পোস্টের ক্যাপশনে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছিল।
ফটোকার্ডে জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকীর প্রসঙ্গ তুলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে গঠিত গণ-আদালত আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে পোস্টের ভাষা ও উপস্থাপনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সমালোচনার ঝড়
পোস্টটি দ্রুত বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই এটিকে অশোভন ও অসম্মানজনক বলে মন্তব্য করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি অংশ রাকসুর সাংস্কৃতিক-বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে জায়িদ হাসানের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সমালোচকদের অনেকে তার পদ স্থগিত বা বাতিলের দাবি জানান। তাদের মতে, এমন মন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা
সমালোচনার মুখে পরে আরেকটি ফেসবুক পোস্টে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন জায়িদ হাসান। সেখানে তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো শহীদের মাকে নিয়ে মন্তব্য করেননি। বরং জাহানারা ইমামের রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, শহীদের মা পরিচয় কাউকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখে না এবং নিজের বক্তব্যের পক্ষে তিনি অনড় রয়েছেন।
বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর নিন্দা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, যুদ্ধাপরাধবিরোধী অবস্থানের কারণেই জাহানারা ইমামকে লক্ষ্য করে এমন মন্তব্য করা হয়েছে।
এদিকে পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আমানউল্লাহ খানও প্রতিবাদ জানিয়ে রাকসুর সভাপতির কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সাংস্কৃতিক-বিষয়ক সম্পাদকের পদ বাতিলের দাবিও উত্থাপন করেন।
জাহানারা ইমামের ভূমিকা
জাহানারা ইমাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণ-আদালত আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধে তার বড় ছেলে শাফী ইমাম রুমী শহীদ হন। পরবর্তীতে তিনি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিবারের আত্মত্যাগ ও জাতীয় জীবনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘শহীদ জননী’ হিসেবে ব্যাপক সম্মান লাভ করেন।
রাকসু নেতা জায়িদ হাসানের মন্তব্যকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: জাহানারা ইমামকে নিয়ে ফেসবুক পোস্টে বিতর্কে জড়ালেন রাবির রাকসু নেতা জায়িদ হাসান, উঠেছে পদ স্থগিতের দাবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















