ভারতের আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে টানা ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন, বহু বাড়িঘর ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আসামের ধেমাজি জেলায় ১৯৬৫ সালে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলসেতুর অংশ ধসে পড়ায় রেল যোগাযোগ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আসামের ছয়টি জেলায় ২২ হাজার ১২৪ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সোমবার আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন এবং চলমান দুর্যোগ মোকাবিলার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন।
ধেমাজিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি
আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এএসডিএমএ) জানিয়েছে, ধেমাজি, নলবাড়ি, ডিব্রুগড়, চিরাং, লাখিমপুর ও কোকরাঝাড় জেলায় বন্যার প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ধেমাজি জেলা, যেখানে ১৫ হাজার ৪৮৩ জন মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন।
![]()
বন্যার পানিতে অন্তত ৯৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং প্রায় এক হাজার ৬৯০ হেক্টর কৃষিজমির ক্ষতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ ও এর উপনদীগুলোর পানি বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি প্রায় ৪৮ হাজার ১৯৯টি গবাদিপশুও বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ধসে পড়ল ১৯৬৫ সালের রেলসেতু
ধেমাজি জেলার আর্চিপাথার ও সিমেন চাপরি স্টেশনের মধ্যবর্তী রেলসেতুর একটি অংশ ধসে পড়ার পর ওই রুটে ট্রেন চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে (এনএফআর) জানিয়েছে, ১৯৬৫ সালে নির্মিত এবং পরে ব্রডগেজে রূপান্তরিত এই সেতুটি ভালো অবস্থায় ছিল। তবে ভারী বৃষ্টিতে নদীতীরের বড় অংশ ভেঙে যাওয়ায় সেতুর একটি পিলার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেতুর অংশ ধসে যায়।
রেল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয়নি এবং কেউ আহতও হননি। নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ওই শাখা রুটে আগেই ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল।
অরুণাচলে অব্যাহত ঝুঁকি
অরুণাচল প্রদেশেও কয়েক দিন আগে মেঘভাঙা বৃষ্টির পর আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ২৮ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, বর্তমান আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে নতুন করে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আরও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
এ পর্যন্ত অরুণাচলে বৃষ্টিজনিত আকস্মিক বন্যায় তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে এখনও অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চলছে।
ত্রাণশিবিরে আশ্রয়হীন পরিবার
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই এখন অস্থায়ী ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। উত্তর-পূর্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করপোরেশনের (এনইইপিসিও) কর্মী রুমি রাভা ও তাঁর স্বামীও এমন একটি ত্রাণশিবিরে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, টানা প্রবল বৃষ্টির মধ্যে তাদের বাসার সীমানাপ্রাচীর ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িটি ভেসে যায়। প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারলেও ঘরের সব আসবাব, স্বর্ণালংকার ও ব্যক্তিগত সম্পদ হারিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, লেকু নদীর পানি এবার প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে গ্রামাঞ্চলে ঢুকে পড়েছে। নদীর উপচে পড়া পানিতে অরুণাচলের পাশাপাশি প্রতিবেশী আসামের জনাই উপবিভাগের কেদিচুকসহ কয়েকটি গ্রামও প্লাবিত হয়েছে।
ভারী বৃষ্টির প্রভাবে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় প্রশাসন বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















