বিয়ে ভেঙে দেওয়া কখনও হত্যার চেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত হতে পারে—এমন একটি সমাজের কথা ভাবাও অস্বস্তিকর। তবু সাম্প্রতিক একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। এক তরুণী, যিনি পারিবারিকভাবে নির্ধারিত বিয়েতে রাজি ছিলেন না, শেষ পর্যন্ত আইনের ভাষায় ভয়াবহ অপরাধের অভিযুক্ত। আদালতই ঠিক করবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কতটা সত্য। কিন্তু এই ঘটনাকে শুধু একটি অপরাধের কাহিনি হিসেবে দেখলে আমরা সেই সামাজিক বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাব, যেখানে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এখনও বহু নারীর কাছে অধরাই রয়ে গেছে।
হত্যার কোনও নৈতিক বা আইনি সাফাই হতে পারে না। কিন্তু একটি অপরাধের পেছনের সামাজিক কাঠামোকে বোঝার চেষ্টা করাও সমান জরুরি। কারণ কোনও সমাজ যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী মনে করেন নিজের ইচ্ছা প্রকাশের চেয়ে নীরব থাকা নিরাপদ, তাহলে সেই সমাজের মূল্যবোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয় মানিয়ে নিতে। পরিবারের সম্মান, আত্মীয়স্বজনের প্রত্যাশা, সামাজিক রীতি—সবকিছুকে নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপরে স্থান দিতে বলা হয়। নিজের মত প্রকাশকে প্রায়ই অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়। ফলাফল হলো, অনেক নারী জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও নিজের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করতে শেখেন না।

ভারতের মতো সমাজে বিয়ে এখনও শুধু দুই মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি দুই পরিবার, সামাজিক মর্যাদা, জাতপাত এবং সম্প্রদায়ের জটিল সমীকরণের অংশ। ফলে কোনও তরুণী যদি পরিবারের পছন্দ করা পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করতে চান, সেটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না; সেটি অনেক সময় পারিবারিক মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের প্রশ্নে পরিণত হয়।
এই বাস্তবতা অপরাধকে বৈধতা দেয় না। প্রতিদিন অসংখ্য তরুণ-তরুণী পারিবারিক চাপ, সামাজিক বিধিনিষেধ ও ব্যক্তিগত সংকটের মুখোমুখি হন। তাঁদের অধিকাংশই আইনের বাইরে যান না। তাই যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবশ্যই আইনের পূর্ণ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে, কেন একটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা এত কঠিন হয়ে ওঠে যে কেউ কেউ ভুল পথে হাঁটার কথা ভাবতে পারেন।
এই ঘটনাটি আরও একটি বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে। যখন একজন নারী অভিযুক্ত হন, তখন সংবাদমাধ্যম ও জনমতের প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ সমাজ নারীদের সাধারণত ভুক্তভোগীর ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত। অভিযুক্ত হিসেবে একজন নারী উপস্থিত হলে সেটি যেন প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ধারণাকে নাড়া দেয়। ফলে ঘটনাটি অপরাধের পাশাপাশি নারীর স্বাধীনতা, নৈতিকতা ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আবেগঘন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
অন্যদিকে প্রতিদিন অসংখ্য নারী পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের নির্যাতন কিংবা স্বামীর হাতে হত্যার শিকার হন। সেসব ঘটনা খুব কম ক্ষেত্রেই জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে পৌঁছায়। অথচ ভারতের সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান দেখায়, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কোনও ব্যতিক্রম নয়; এটি এক গভীর সামাজিক সংকট। যৌতুকের কারণে মৃত্যুর ঘটনা থেকে শুরু করে গার্হস্থ্য নির্যাতন—অনেক অপরাধই নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও বড় সত্য হলো, এসব ঘটনার বড় অংশ কখনও অভিযোগ হিসেবেই নথিভুক্ত হয় না।
![]()
এই বৈষম্যমূলক মনোযোগ আমাদের সংবাদবোধ এবং সামাজিক সংবেদনশীলতারও প্রতিফলন। একজন পুরুষ নিহত হলে এবং অভিযুক্ত যদি তাঁর হবু স্ত্রী হন, সেটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রতিদিনের নারী হত্যাকাণ্ড প্রায়ই সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, একজন নারী কেন ‘না’ বলতে পারেন না? কেন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এখনও অনেক পরিবারের কাছে অগ্রহণযোগ্য? কেন ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করা, ভিন্ন জাত বা ধর্মে বিবাহ, কিংবা নিজের পছন্দমতো জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া এখনও বহু মানুষের কাছে সামাজিক বিদ্রোহের সমান?
ভারতের বিভিন্ন সমীক্ষা দেখায়, অধিকাংশ বিয়েই এখনও পরিবার নির্ধারণ করে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর নিজের বিয়ের সিদ্ধান্তে কার্যত কোনও মতামত থাকে না। অনেক দম্পতির প্রথম দেখা হয় বিয়ের দিনেই। এই বাস্তবতা বোঝায়, ব্যক্তিগত সম্মতি এখনও সামাজিক রীতির কাছে অনেকাংশে গৌণ।
যে সমাজে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, সেখানে সংকট শুধু ব্যক্তির নয়; পুরো সামাজিক কাঠামোর। সম্মতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা যদি পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি না হয়, তাহলে সেই সম্পর্কের ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই ঘটনার শিক্ষা তাই কোনওভাবেই অপরাধকে ব্যাখ্যা করা নয়। বরং শিক্ষা হলো, এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে একজন তরুণী বা তরুণ নিজের পছন্দের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া বিয়েকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন—ভয়, লজ্জা বা সামাজিক প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই। কারণ একটি সুস্থ সমাজে ‘না’ বলা কখনও অপরাধ নয়; বরং সেটিই ব্যক্তিস্বাধীনতার সবচেয়ে মৌলিক প্রকাশ।
নমিতা ভান্ডারে 


















