মিস ইউনিভার্স ২০২৫ ফাতিমা বোস আফগান নারীদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, পৃথিবীর প্রতিটি মেয়ের শিক্ষা লাভ, স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের অধীনে নারীদের বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
শিক্ষা ও স্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে অবস্থান
ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ফাতিমা বোস লেখেন, প্রতিটি মেয়েই শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার যোগ্য। নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে আফগান নারীদের বাস্তবতার তুলনা করে তিনি একাধিক ছবি প্রকাশ করেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নীল বোরকা পরা আফগান নারীদের কঠিন জীবনসংগ্রামের দৃশ্য তুলে ধরা হয়। ছবিগুলোতে দেখা যায়, কেউ কাজ করছেন, কেউ খাদ্য সহায়তার অপেক্ষায়, আবার কেউ মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
একটি ছবিতে লেখা ছিল, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে এমন একজন নারী আছেন, যিনি আমার মতোই যোগ্য, আমার মতোই স্বপ্ন দেখেন এবং কঠোর পরিশ্রম করেন। হয়তো তিনি আমার চেয়েও ভালো মানুষ। কিন্তু পার্থক্য শুধু একটাই—তিনি একটি শরণার্থী শিবিরে আছেন এবং তার নিজের কণ্ঠস্বর নেই।

তালেবান শাসনে নারীদের ওপর বাড়তি বিধিনিষেধ
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে আফগানিস্তানে নারী ও কিশোরীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পার্ক, জিম, বিউটি সেলুনসহ বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে নারীদের প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কর্মসংস্থান, ভ্রমণ এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
তালেবান সরকার নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে নতুন বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান গঠন করে। ২০২২ সালের মার্চে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার সময় নারীদের সঙ্গে একজন নিকটাত্মীয় পুরুষ অভিভাবক বা ‘মাহরাম’ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রেও কর্মস্থলে যাওয়ার সময় একই নিয়ম অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর পাশাপাশি নারীদের টেলিভিশনে উপস্থিত হওয়া নিষিদ্ধ করা হয় এবং নারী সংবাদকর্মীদের সম্প্রচারের সময় মুখ ঢেকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের শেষ দিকে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) কাজ করাও নিষিদ্ধ করা হয়।

জাতিসংঘের উদ্বেগ
২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের ৭৮ শতাংশের বেশি নারী বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নন। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলমান বিধিনিষেধের কারণে আফগান নারীরা তুলনামূলকভাবে কম এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর থেকে নারী ও কিশোরীদের চলাচল, শিক্ষা, অংশগ্রহণ এবং মৌলিক অধিকার সীমিত করতে প্রায় ১০০টি নির্দেশনা ও বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে। এসবের একটিও এখন পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক মনোযোগের আহ্বান
ফাতিমা বোসের এই বার্তা আবারও আফগান নারীদের চলমান সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে নারীদের শিক্ষা, স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















