ইন্দোনেশিয়ার উচ্চশিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল দেশটির শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ। তবে এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীরা ক্রমেই চীনের দিকে ঝুঁকছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে আদর্শিক নয়, বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। কারণ চীন এখন ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী।
শিক্ষায় নতুন অংশীদারিত্ব
সম্প্রতি জাকার্তার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনের একটি সাংস্কৃতিক দলের পরিবেশনা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় একের পর এক চীনের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি শুরু করেছে।
বর্তমানে দ্বৈত ডিগ্রি কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার একটি অংশ ইন্দোনেশিয়ায় এবং বাকি অংশ চীনের অংশীদার বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করছে। কয়েক বছর আগেও এ ধরনের সুযোগ মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল।
শিল্পের চাহিদা মেটাতে দক্ষ জনশক্তি
চীনের বিনিয়োগে ইন্দোনেশিয়ায় নিকেল প্রক্রিয়াজাতকরণ, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনসহ একাধিক শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব শিল্পে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে।
শুধু পাঠদান নয়, যৌথ গবেষণাগার, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং শিল্প-শিক্ষা সংযোগেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব শিল্পক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে।
শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আগ্রহ
ইন্দোনেশিয়ার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে চীনের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। প্রকৌশল, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, গবেষণা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে দুই দেশের সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমনকি চীনের একটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর নির্দিষ্টসংখ্যক ইন্দোনেশীয় শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার উদ্যোগও নিয়েছে, যা দেশটির জন্য বিশেষ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের পছন্দেও পরিবর্তন
আগে বিদেশে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের তালিকায় পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নামই বেশি থাকত। এখন সেই তালিকায় দ্রুত উঠে আসছে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্ব এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কারণে চীনে পড়াশোনা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে চীনে অধ্যয়নরত ইন্দোনেশীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি।
অর্থনৈতিক সম্পর্কই পরিবর্তনের চালিকা শক্তি
দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। চীন টানা বহু বছর ধরে ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে রয়েছে। পাশাপাশি নিকেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি শিল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব শিল্প পরিচালনার জন্য দক্ষ স্থানীয় কর্মী তৈরি করা এখন উভয় দেশেরই অগ্রাধিকার। আর সেই লক্ষ্য পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আদর্শ নয়, সুযোগের অনুসন্ধান
ইন্দোনেশিয়ার নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক পরিবর্তনের প্রতিফলন নয়। বরং যেখানে ভালো শিক্ষা, আধুনিক গবেষণা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, সেখানেই দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাঠানোর নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে এই শিক্ষাগত সহযোগিতা আরও গভীর হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হবে এবং নতুন প্রজন্মের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















