ক্যারিবীয় অঞ্চলের কৃষিতে কীটনাশকের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এখন বড় ধরনের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কীটনাশকের পরিমাণ নয়, বরং যেভাবে এবং যত ঘন ঘন এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। এর ফলে কৃষিজমি, নদী, সামুদ্রিক পরিবেশ, বন্যপ্রাণী এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।
প্রতি হেক্টরে বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যবহারকারীদের মধ্যে
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি হেক্টর জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় ক্যারিবীয় অঞ্চলের একাধিক দ্বীপরাষ্ট্র রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ দশ ব্যবহারকারীর মধ্যে পাঁচটিই এই অঞ্চলের। উদাহরণ হিসেবে, সেন্ট লুসিয়ায় প্রতি হেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে এই ব্যবহার রাশিয়ার তুলনায় প্রায় ত্রিশ গুণ বেশি।
কেন এত বেশি কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে

এই অঞ্চলের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া পোকামাকড় ও আগাছার দ্রুত বিস্তারে সহায়তা করে। পাহাড়ি জমিতে কীটনাশকের কার্যকারিতা কমে যায়। কৃষিশ্রমিকের সংকট থাকায় অনেক কৃষক আগাছা দমনে রাসায়নিকের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এছাড়া ছোট বাজারের কারণে পরিবেশবান্ধব বিকল্প সহজে পাওয়া যায় না। উপনিবেশিক আমলের বহু বাণিজ্যিক ফসল রোগবালাইয়ের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য নিখুঁত মানের ফল ও ফসলের চাহিদাও কৃষকদের আরও বেশি রাসায়নিক ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।
প্রশিক্ষণের অভাব বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কৃষকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। ফলে তারা সময়মতো রোগ বা পোকামাকড় শনাক্ত করতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার প্রকৃতি না বুঝেই ভুল কীটনাশক, ভুল মাত্রায় এবং ভুল সময়ে ব্যবহার করা হয়। এতে একদিকে খরচ বাড়ে, অন্যদিকে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
নিয়ন্ত্রণে শৈথিল্য
অঞ্চলটির অনেক দেশ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ কিছু কীটনাশকের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেনি। এমন কিছু রাসায়নিক রয়েছে, যেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু আগেই নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ক্যারিবীয় অঞ্চলের কিছু দেশে সেগুলো এখনও ব্যবহার হচ্ছে। ফলে কৃষি নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আত্মহত্যার আশঙ্কা
দীর্ঘদিন কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকলে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। বিশেষ করে প্রোস্টেট ক্যানসার ও রক্তের কিছু জটিল রোগের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
সহজে বিষাক্ত কীটনাশক পাওয়া যাওয়ায় আত্মহত্যার ঘটনাও বাড়তে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব রাসায়নিক আত্মহত্যার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পরিবেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি

ক্ষেতে ব্যবহার করা আগাছানাশক ও অন্যান্য রাসায়নিক বৃষ্টির পানির সঙ্গে নদী, খাল ও উপকূলীয় জলাশয়ে পৌঁছে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতি করছে। প্রবালপ্রাচীরও ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবহৃত কীটনাশকের খালি পাত্র যথেচ্ছভাবে ফেলে দেওয়ায় গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণীরও ক্ষতি হচ্ছে।
মাটির ভেতরে থাকা উপকারী কেঁচো, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব ধ্বংস হওয়ায় কৃষিজমির স্বাভাবিক উর্বরতাও কমছে। এতে ভবিষ্যতে উৎপাদন ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী থাকতে পারে প্রভাব
ক্যারিবীয় অঞ্চলের কিছু দ্বীপে বহু বছর আগে নিষিদ্ধ হওয়া একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কীটনাশকের দূষণ এখনও রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের রাসায়নিক মাটিতে শত শত বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। ফলে অনেক জমিতে নিরাপদভাবে ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অঞ্চলকে দীর্ঘ সময় ধরে কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব বহন করতে হতে পারে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার শেষ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—তিন ক্ষেত্রেই বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















