০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
রপ্তানির উল্লাস নয়, বাণিজ্য ঘাটতির বাস্তবতা: থাইল্যান্ডের অর্থনীতির সামনে কাঠামোগত সংকট সাংবাদিক শাহেদ কামাল যিনি ৯০-এর দশকে বুঝেছিলেন বাঙালির সংস্কৃতি হাসপাতালের বেডে সরকারি অর্থের প্রকৃত ঠিকানা: ট্রেজারি সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর কাবুলে পানির সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতা, শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নও ঝুঁকিতে ‘দ্য ওডিসি’ প্রচারে দেবী-প্রেরণার সাজে জেনডায়া, ফ্যাশনে চরিত্রের ভাষা কঙ্গোয় ইবোলা চিকিৎসায় প্রথম ট্রায়াল শুরু, ১৪০০ জন আক্রান্ত অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করতে দিল না মিয়ানমার জান্তা থাই বিমানসেবিকার মাধ্যমে হেরোইন পাচার, উৎস মিয়ানমার সন্দেহ পঁচিশ বছর পর তাইওয়ান সেনায় ফিরল কমিউনিস্ট বিরোধী শিক্ষা আমির খানের ব্যক্তিগত আয়োজনে বিয়ে, গৌরী স্প্রাটের সঙ্গে নতুন অধ্যায়

রপ্তানির উল্লাস নয়, বাণিজ্য ঘাটতির বাস্তবতা: থাইল্যান্ডের অর্থনীতির সামনে কাঠামোগত সংকট

দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ডকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায়ই অর্থনীতির শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বাণিজ্য ঘাটতির দিকে গভীরভাবে তাকালে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে। এটি কেবল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং উৎপাদন, আমদানি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে থাইল্যান্ডের অবস্থানের একটি মৌলিক দুর্বলতার প্রতিফলন।

অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে এলে থাইল্যান্ড আবার আগের মতো বাণিজ্য উদ্বৃত্তে ফিরবে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা সমস্যার একটি অংশকে ব্যাখ্যা করলেও পুরো চিত্রটি তুলে ধরে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, দেশের রপ্তানি কাঠামো কি আগের মতো শক্তিশালী রয়েছে, নাকি সেটিই ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে?

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে থাইল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও উদ্বৃত্ত পুরোপুরি হারায়নি। ২০২২ সালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে পৌঁছানোর পর কিছু সময়ের জন্য ঘাটতি দেখা দিলেও পরে আবার উদ্বৃত্তে ফিরে আসে দেশটি। অর্থাৎ, তখনকার ঘাটতি ছিল মূলত জ্বালানি ব্যয়ের চাপের ফল।

কিন্তু ২০২৬ সালের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একই ধরনের তেলের দাম থাকা সত্ত্বেও এপ্রিল মাসে রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে কেবল জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে বর্তমান সংকটের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। অর্থনীতির ভেতরে আরও গভীর পরিবর্তন ঘটছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘাটতির একটি অংশ অবশ্যই উচ্চ জ্বালানি আমদানির কারণে তৈরি হয়েছে। তবে সমান গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে চীন ও তাইওয়ান থেকে আমদানির দ্রুত বৃদ্ধি। এই দুই উৎসের প্রভাব সাময়িক নয়; বরং শিল্প কাঠামো ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

থাইল্যান্ডের রপ্তানি খাতের আরেকটি উদ্বেগজনক বৈশিষ্ট্য হলো দেশটির ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা নির্দিষ্ট বাজারের ওপর। চীনা নববর্ষের সময় চীন ও তাইওয়ানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে গেলে থাইল্যান্ডের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এর অর্থ, থাইল্যান্ডের রপ্তানি কার্যক্রম এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক গতিশীলতার চেয়ে অংশীদার দেশের ব্যবসায়িক ক্যালেন্ডার বেশি প্রভাব ফেলছে।

এটি কেবল বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বেরও প্রশ্ন। যখন একটি দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি এতটাই বাইরের বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে বিদেশের ছুটির দিন পর্যন্ত তার অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে, তখন সেই দেশের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতাও সীমিত হয়ে যায়।

আরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ মূল্য নির্ধারণ বা ট্রান্সফার প্রাইসিং। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি মূল কোম্পানি তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমনভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে, যাতে মুনাফার বড় অংশ অন্য দেশে স্থানান্তরিত হয়।

ধরা যাক, কোনো মধ্যবর্তী উপাদান উচ্চমূল্যে থাইল্যান্ডে আমদানি করা হলো। পরে সেটি সংযোজনের পর চূড়ান্ত পণ্য তুলনামূলক কম দামে বিদেশে রপ্তানি করা হলো। ফলে উৎপাদনের কাজ থাইল্যান্ডে হলেও প্রকৃত আর্থিক সুবিধা অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যায়। এতে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত হয় না; বরং ঘাটতি আরও বেড়ে যেতে পারে।

এই বাস্তবতা প্রশ্ন তোলে—যে রপ্তানি থেকে দেশ পর্যাপ্ত মূল্য সংযোজন কিংবা মুনাফা অর্জন করতে পারে না, সেই রপ্তানি বৃদ্ধিকে কি সত্যিই অর্থনৈতিক সাফল্য বলা যায়?

Thailand's Trade Deficit Hits Record $10 Billion as Imports Soar - Bloomberg

ফল উৎপাদনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অভিযোগ আগে উঠে এসেছে। উৎপাদক পর্যায়ে একটি দামে পণ্য কেনা হলেও আন্তর্জাতিক লেনদেনে ভিন্ন মূল্য দেখানোর মাধ্যমে প্রকৃত লাভ অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ফলে উৎপাদক যেমন ন্যায্য মূল্য পান না, তেমনি দেশের রপ্তানি হিসাবও প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না।

এদিকে আরেকটি বড় চাপ তৈরি করছে তথাকথিত “চায়না শক”। চীনে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে প্রবেশ করছে। কম দামে এসব পণ্য থাইল্যান্ডে ঢুকছে এবং স্থানীয় শিল্পকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে।

স্বল্পমূল্যের আমদানির কারণে ভোক্তারা সাময়িকভাবে লাভবান হতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় শিল্প উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একটি অর্থনীতি তখন ধীরে ধীরে উৎপাদনকেন্দ্র থেকে ভোক্তাবাজারে পরিণত হতে থাকে।

রপ্তানি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান তাই সব সময় ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। যদি সেই রপ্তানি বিদেশি উপাদানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, যদি উৎপাদনের মূল মুনাফা বিদেশে চলে যায়, অথবা যদি রপ্তানি যত বাড়ে বাণিজ্য ঘাটতিও তত বাড়তে থাকে, তাহলে কেবল রপ্তানির মোট অঙ্ক দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্য বিচার করা বিভ্রান্তিকর।

একইভাবে, নতুন যন্ত্রপাতি আমদানির যুক্তিও সব ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। যদি সেই যন্ত্র বিদেশি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরই পণ্য তৈরি করে, তাহলে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে, সেটিও মূল্যায়ন করা জরুরি। শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক বাড়লেই তা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করে না।

থাইল্যান্ডের বর্তমান অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু রপ্তানির পরিমাণের চেয়ে তার গুণগত মান, দেশীয় মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় প্রবৃদ্ধির চমকপ্রদ পরিসংখ্যানের আড়ালে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা ক্রমেই গভীর হতে থাকবে।

আজ থাইল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাণিজ্য ঘাটতিকে সাময়িক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা নয়; বরং স্বীকার করা যে অর্থনীতির ভিত্তিতে পরিবর্তন ঘটছে। সেই পরিবর্তনকে যত দ্রুত বাস্তবসম্মত নীতির মাধ্যমে মোকাবিলা করা যাবে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি ততই কমানো সম্ভব হবে। রপ্তানির সংখ্যাগত সাফল্যের চেয়ে অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সমৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানির উল্লাস নয়, বাণিজ্য ঘাটতির বাস্তবতা: থাইল্যান্ডের অর্থনীতির সামনে কাঠামোগত সংকট

রপ্তানির উল্লাস নয়, বাণিজ্য ঘাটতির বাস্তবতা: থাইল্যান্ডের অর্থনীতির সামনে কাঠামোগত সংকট

০৮:০০:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ডকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায়ই অর্থনীতির শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বাণিজ্য ঘাটতির দিকে গভীরভাবে তাকালে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে। এটি কেবল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং উৎপাদন, আমদানি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে থাইল্যান্ডের অবস্থানের একটি মৌলিক দুর্বলতার প্রতিফলন।

অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে এলে থাইল্যান্ড আবার আগের মতো বাণিজ্য উদ্বৃত্তে ফিরবে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা সমস্যার একটি অংশকে ব্যাখ্যা করলেও পুরো চিত্রটি তুলে ধরে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, দেশের রপ্তানি কাঠামো কি আগের মতো শক্তিশালী রয়েছে, নাকি সেটিই ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে?

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে থাইল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও উদ্বৃত্ত পুরোপুরি হারায়নি। ২০২২ সালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে পৌঁছানোর পর কিছু সময়ের জন্য ঘাটতি দেখা দিলেও পরে আবার উদ্বৃত্তে ফিরে আসে দেশটি। অর্থাৎ, তখনকার ঘাটতি ছিল মূলত জ্বালানি ব্যয়ের চাপের ফল।

কিন্তু ২০২৬ সালের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একই ধরনের তেলের দাম থাকা সত্ত্বেও এপ্রিল মাসে রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে কেবল জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে বর্তমান সংকটের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। অর্থনীতির ভেতরে আরও গভীর পরিবর্তন ঘটছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘাটতির একটি অংশ অবশ্যই উচ্চ জ্বালানি আমদানির কারণে তৈরি হয়েছে। তবে সমান গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে চীন ও তাইওয়ান থেকে আমদানির দ্রুত বৃদ্ধি। এই দুই উৎসের প্রভাব সাময়িক নয়; বরং শিল্প কাঠামো ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

থাইল্যান্ডের রপ্তানি খাতের আরেকটি উদ্বেগজনক বৈশিষ্ট্য হলো দেশটির ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা নির্দিষ্ট বাজারের ওপর। চীনা নববর্ষের সময় চীন ও তাইওয়ানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে গেলে থাইল্যান্ডের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এর অর্থ, থাইল্যান্ডের রপ্তানি কার্যক্রম এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক গতিশীলতার চেয়ে অংশীদার দেশের ব্যবসায়িক ক্যালেন্ডার বেশি প্রভাব ফেলছে।

এটি কেবল বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বেরও প্রশ্ন। যখন একটি দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি এতটাই বাইরের বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে বিদেশের ছুটির দিন পর্যন্ত তার অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে, তখন সেই দেশের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতাও সীমিত হয়ে যায়।

আরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ মূল্য নির্ধারণ বা ট্রান্সফার প্রাইসিং। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি মূল কোম্পানি তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমনভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে, যাতে মুনাফার বড় অংশ অন্য দেশে স্থানান্তরিত হয়।

ধরা যাক, কোনো মধ্যবর্তী উপাদান উচ্চমূল্যে থাইল্যান্ডে আমদানি করা হলো। পরে সেটি সংযোজনের পর চূড়ান্ত পণ্য তুলনামূলক কম দামে বিদেশে রপ্তানি করা হলো। ফলে উৎপাদনের কাজ থাইল্যান্ডে হলেও প্রকৃত আর্থিক সুবিধা অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যায়। এতে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত হয় না; বরং ঘাটতি আরও বেড়ে যেতে পারে।

এই বাস্তবতা প্রশ্ন তোলে—যে রপ্তানি থেকে দেশ পর্যাপ্ত মূল্য সংযোজন কিংবা মুনাফা অর্জন করতে পারে না, সেই রপ্তানি বৃদ্ধিকে কি সত্যিই অর্থনৈতিক সাফল্য বলা যায়?

Thailand's Trade Deficit Hits Record $10 Billion as Imports Soar - Bloomberg

ফল উৎপাদনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অভিযোগ আগে উঠে এসেছে। উৎপাদক পর্যায়ে একটি দামে পণ্য কেনা হলেও আন্তর্জাতিক লেনদেনে ভিন্ন মূল্য দেখানোর মাধ্যমে প্রকৃত লাভ অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ফলে উৎপাদক যেমন ন্যায্য মূল্য পান না, তেমনি দেশের রপ্তানি হিসাবও প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না।

এদিকে আরেকটি বড় চাপ তৈরি করছে তথাকথিত “চায়না শক”। চীনে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে প্রবেশ করছে। কম দামে এসব পণ্য থাইল্যান্ডে ঢুকছে এবং স্থানীয় শিল্পকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে।

স্বল্পমূল্যের আমদানির কারণে ভোক্তারা সাময়িকভাবে লাভবান হতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় শিল্প উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একটি অর্থনীতি তখন ধীরে ধীরে উৎপাদনকেন্দ্র থেকে ভোক্তাবাজারে পরিণত হতে থাকে।

রপ্তানি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান তাই সব সময় ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। যদি সেই রপ্তানি বিদেশি উপাদানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, যদি উৎপাদনের মূল মুনাফা বিদেশে চলে যায়, অথবা যদি রপ্তানি যত বাড়ে বাণিজ্য ঘাটতিও তত বাড়তে থাকে, তাহলে কেবল রপ্তানির মোট অঙ্ক দিয়ে অর্থনীতির স্বাস্থ্য বিচার করা বিভ্রান্তিকর।

একইভাবে, নতুন যন্ত্রপাতি আমদানির যুক্তিও সব ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। যদি সেই যন্ত্র বিদেশি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরই পণ্য তৈরি করে, তাহলে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে, সেটিও মূল্যায়ন করা জরুরি। শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক বাড়লেই তা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করে না।

থাইল্যান্ডের বর্তমান অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু রপ্তানির পরিমাণের চেয়ে তার গুণগত মান, দেশীয় মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় প্রবৃদ্ধির চমকপ্রদ পরিসংখ্যানের আড়ালে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা ক্রমেই গভীর হতে থাকবে।

আজ থাইল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাণিজ্য ঘাটতিকে সাময়িক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা নয়; বরং স্বীকার করা যে অর্থনীতির ভিত্তিতে পরিবর্তন ঘটছে। সেই পরিবর্তনকে যত দ্রুত বাস্তবসম্মত নীতির মাধ্যমে মোকাবিলা করা যাবে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি ততই কমানো সম্ভব হবে। রপ্তানির সংখ্যাগত সাফল্যের চেয়ে অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সমৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড।